সুমি রানির বয়স এখন ১৬ বছর। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি মেয়েটি।
সুমির বাড়ি দুর্গম চরাঞ্চলে। স্কুলে যেতে হতো অনেকটা পথ পেরিয়ে। প্রথমে হেঁটে, এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে যেতে হতো স্কুলে। শুধু নদী পার হতেই কখনো কখনো প্রায় এক ঘণ্টা লেগে যেত।
সুমির মায়ের ভাষ্য, প্রাইভেট পড়া, কোচিং, খাতা-কলম, খাবার ও যাতায়াতসহ এক সন্তানের পড়াশোনায় মাসে প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হতো।
‘স্কুলের দূরত্ব আর টাকার অভাবে মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিই,’ বলেন তিনি।
সাতক্ষীরা, নড়াইল, গাজীপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, পটুয়াখালী, রাজশাহী ও ঢাকার কড়াইলসহ বিভিন্ন এলাকার স্কুল থেকে ঝরে পড়া মেয়ে, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছেসংবাদমাধ্যম।
তাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। পড়াশোনা ও যাতায়াতের খরচ, স্কুলের দূরত্ব, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক চাপ, ঘরের কাজ এবং কৈশোরের সম্পর্কের পাশাপাশি পড়াশোনায় আগ্রহ হারানোও এর কারণ। পরিবারের আর্থিক সংকটে কেউ কেউ গৃহকর্মী, কারখানার শ্রমিক কিংবা স্বল্প মজুরির অন্য কোনো কাজে যোগ দেয়।
স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের নিয়ে ব্র্যাকের একটি প্রকল্পের নথিতেও এসব বাধার কথা উঠে এসেছে। দারিদ্র্য, স্কুলের অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, অভিভাবকদের শিক্ষা ও সন্তানদের পড়াশোনায় সম্পৃক্ততার অভাব, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, স্থানান্তর এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগকে শিক্ষার পথে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে ব্র্যাক।
নথিতে বলা হয়, শুধু স্কুলে ভর্তি থাকলেই যে শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে, তা নয়। অনিয়মিত উপস্থিতি বা দুর্বল ফলাফলের কারণে অনেক শিশু কার্যত পড়াশোনার বাইরে চলে গেলেও সরকারি হিসাবে তা ধরা নাও পড়তে পারে।
আয়েশা আখতারের বয়স এখন ১৬। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ৩ বছর আগে বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা। কারণ, তাদের ইউনিয়নে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না।
আয়েশার বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘৪-৫ কিলোমিটার দূরে একটি স্কুল ছিল। আরেকটি ছিল ১৩-১৪ কিলোমিটার দূরে। সেখানে যেতে নৌকায় নদী পার হতে হতো।
তিনি জানান, নৌকা ও রিকশাভাড়া, খাবারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হতো মেয়ের স্কুলে যাতায়াতে। বর্ষায় রাস্তাঘাট মাসের পর মাস পানিতে ডুবে থাকত।
পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার দুই বছর পর ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয় আয়েশার। অর্থাৎ, তার ক্ষেত্রে বিয়ের আগেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
আয়েশার বাবা বলেন, ‘মেয়েরা যখন পড়াশোনা না করে ঘরে বসে থাকে, তখন মানুষ তাদের অন্য চোখে দেখে।
এলাকার কয়েকজন ছেলে বারবার তার মেয়ের ফোন নম্বর চাইত বলেও জানান তিনি।
আয়েশার ছোট বোন এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন তার বাবা।
ব্র্যাকের প্রকল্পের নথিতে কুড়িগ্রামকে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা জেলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২১ সালের বার্ষিক খাতভিত্তিক কর্মসম্পাদন প্রতিবেদন (এএসপিআর) থেকে উদ্ধৃত করে সেখানে ঝরে পড়ার হার ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ বলা হয়েছে। চরাঞ্চলসহ দুর্গম ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় শিক্ষার সুযোগ সীমিত বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পড়াশোনার খরচও অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা। ক্যাম্পে’র ২০২৩ সালের এডুকেশন ওয়াচ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে পরিবারগুলো নিজস্ব অর্থ থেকে গড়ে ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা খরচ করেছে। এর মধ্যে প্রাইভেট পড়া ও গাইড বই কেনার খরচও রয়েছে।
এক কৃষক সাংবাদিকদের বলেন, তার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেয়ের পড়াশোনায় মাসে ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে রয়েছে দুটি টিউশন, স্কুলের কোচিং ও বাসায় গৃহশিক্ষকের খরচ।
তিনি চান, মেয়ে অন্তত এসএসসি পাস করুক। এরপর তার বিয়ের কথা ভাবতে পারেন।
পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন ওই কৃষক।
গাজীপুরের এক তরুণ শ্রমজীবীর অভিজ্ঞতাও একই চিত্র তুলে ধরে। পাঁচ ভাই ও চার বোনের পরিবারে ভাইয়েরা কিছুটা পড়াশোনার সুযোগ পেলেও বোনেরা চালিয়ে যেতে পারেননি।
ওই তরুণ বলেন, ‘এখন পড়াশোনার খরচ অনেক। তাই বাবা পড়াতে পারেননি।
তার অসুস্থ বাবা দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী।
আরেক পরিবারের বাবা জানান, আর্থিক সংকটের কারণে দুই ছেলেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াতে পারলেও মেয়েকে এসএসসি পর্যন্ত পড়ানোর পর বিয়ে দিতে হয়েছে।
ব্র্যাকের প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, অনেক পরিবারে মেয়েদের শিক্ষাকে ছেলেদের তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের পাশাপাশি এমন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও শিশুদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে শুধু অর্থের অভাবেই যে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়, তা নয়।
সাতক্ষীরার ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী এসএসসি পাস করার পর প্রেমের কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে বিয়ে করেন। এখন তার ছয় মাস বয়সী সন্তান রয়েছে। তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করতে চান।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমার মা চান আমি পড়াশোনা করি, কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকজন চান না।
আরেক নারী অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা ছেড়ে দেন। প্রায় ১৬–১৭ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়।
তিনি জানান, পরিবারের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি পড়াশোনায় আগ্রহ হারানোও তার স্কুল ছাড়ার কারণ ছিল। নিজেও বিয়ে করতে চেয়েছিলেন তিনি।
বাল্যবিবাহের সঙ্গে মেয়েদের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সম্পর্ক স্পষ্ট। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিবাহিত মেয়েদের ঝরে পড়ার সম্ভাবনা অবিবাহিত মেয়েদের তুলনায় ৪ গুণের বেশি।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, স্কুলের বাইরে থাকা মেয়েরা বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে, স্কুল থেকে ঝরে পড়া ছেলেদের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাতেও উঠে এসেছে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার নানা কারণ।
ঢাকার কড়াইলের মায়ের দোয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনির হোসেন বলেন, বেতন মওকুফ করেও মেয়েদের অনেক সময় স্কুলে ধরে রাখা যায় না।
‘কেউ কেউ মায়ের কাজের জন্য ঘরে থেকে ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করে। আবার কেউ পরিবারের খরচ জোগাতে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়,’ বলেন তিনি।
গাজীপুরের শিক্ষক শামসুল আলম বলেন, অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার ও কৈশোরের সম্পর্ক কিছু শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
তার ভাষ্য, কোনো কোনো মেয়েকে পরিবার বিয়ে দিয়ে দেয়, আবার কেউ কেউ নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করে।
তিনি বলেন, ‘পরে তাদের কেউ কারখানা, গুদাম ও হোটেলে কাজ নেয়, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে।
একেকটি শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের ঝরে পড়ার হারও বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা সমাপ্তির হার ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ। নিম্নমাধ্যমিকে তা কমে ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। উচ্চমাধ্যমিকে এই হার মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
জরিপে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ১৫ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের।
২০১৯ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫১ দশমিক ৪ এবং ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, বাল্যবিবাহের হার কিছুটা কমলেও সমস্যাটি রয়ে গেছে। একই জরিপে দেখা যায়, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসিফ আহমেদ বলেন, স্কুল থেকে ঝরে পড়া ঠেকাতে সরকার ছেলে-মেয়ে সবার জন্যই কাজ করছে।
তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখতে উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই ও মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বিনামূল্যে স্কুলের পোশাক, জুতা ও মোজা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আসিফ বলেন, ‘উপস্থিতি বাড়ানো ও ঝরে পড়া ঠেকাতে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষসহ স্কুলের সুযোগ-সুবিধা উন্নত করার উদ্যোগও রয়েছে।
তবে যারা ইতিমধ্যে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, তাদের জন্য সুযোগ এখনো সীমিত।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিচালক দেবব্রত চক্রবর্তী বলেন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি কর্মসূচি এখনো সীমিত, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে।
তিনি জানান, ব্যুরো সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের জন্য প্রাক-কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এসব প্রশিক্ষণে অন্তত ৫০ শতাংশ মেয়েদের সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতি ব্যাচে সর্বোচ্চ ২০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিতে পারে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া আর ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুদের জন্য রয়েছে সেতুবন্ধন কোর্স, যার মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণি সমমানের সনদ অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়।
দেবব্রত বলেন, বাল্যবিবাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব সামলে মেয়েদের পক্ষে আবার পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাক্ষাৎকারদাতাদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে এই৯ প্রতিবেদনে কয়েকজনের নাম প্রকাশ করা হয়নি।



