সুস্থ হয়ে আবারও দায়িত্বে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তবে মানতে নারাজ শিক্ষার্থীরা।
উপাচার্যের দাবি, এক্ষেত্রে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে তার প্রতি।
অন্যদিকে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের এক দফা দাবিতে বুধবারও ক্লাশ-পরীক্ষা বর্জন করে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা।
ফলে সরকার ও শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থানের কারণে চুয়েটের অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
এর আগে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রশাসনিক ভবন-২-এর তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। এ সময় তার সঙ্গে চুয়েট ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও ছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা ওই দিন দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যকে ক্যাম্পাস ত্যাগের আলটিমেটাম দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ না করায় উপাচার্যসহ ১২ জন প্রশাসনিক ভবন-২-এ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কার্যালয়ের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার একপর্যায়ে অবরুদ্ধ থাকা একজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাতেই তাকে নগরীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরদিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মধ্যস্থতায় মুক্ত হন উপাচার্য। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় ভবনে থাকা চুয়েটের বর্তমান ও সাবেক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের। পরে অসুস্থ উপাচার্যকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের করার সময় ‘চুয়েট ক্যাম্পাসে আর প্রবেশ করবেন না’—এমন শর্তে উপাচার্যকে যেতে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন শিক্ষার্থীরা।
তবে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম দাবি করেছেন, এমন কোনো শর্ত মেনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেননি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার এক বিবৃতি দেন চুয়েট উপাচার্য। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে যে, আমি পদত্যাগ করেছি এবং ভবিষ্যতে কখনো চুয়েট ক্যাম্পাসে পদার্পণ করব না—এ ধরনের কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি আমি দিইনি। যখন আমাকে বের করে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন আমি কথা বলার মতো শারীরিক অবস্থাতেই ছিলাম না। অসুস্থতার কারণেই ক্যাম্পাস ছেড়েছি। এখনো আমি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছি। সুস্থ হয়ে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করব ইনশাআল্লাহ।
উপাচার্যের এ বক্তব্যের পর পাল্টা বিবৃতি দিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরাও। বিবৃতিতে তারা জানান, প্রস্থানের আগে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে আমরা ডিসি ও এসপি মহোদয়কে স্পষ্টভাবে জানাই, তিনি ক্যাম্পাসে আর আসবেন না—এই শর্তেই তাকে বের হতে দেওয়া হবে। সেই সময় তারা ‘ঠিক আছে’ বলে ভেতরে যান। ভেতর থেকে যখন তারা বেরিয়ে আসেন, তখন আমরা তিনবার মিডিয়ার সামনে স্পষ্টভাবে বলি, আমরা তাকে এই শর্তেই ছাড়ছি যেন তিনি আর ক্যাম্পাসে না আসেন। এ সময় তিনি বা তার সঙ্গে থাকা বাকি ৯ জন কোনো বিরোধিতা করেননি, এমনকি হাতের ইশারাও করেননি। এ কারণে আশ্বস্ত হয়ে আমরা তাকে প্রস্থানের সুযোগ দিই। তিনি এখন আবার ক্যাম্পাসে আসার কথা বলছেন; এমন চেষ্টা করা হলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে।
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত। অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে উপাচার্য হিসেবে তারা গ্রহণ করবেন না। ক্যাম্পাসে তার প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা নতুন করে সংকট তৈরি করতে পারে বলেও তারা সতর্ক করেন। এর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদেরই বহন করতে হবে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
উপাচার্য ও শিক্ষার্থীদের এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে দাবি আদায়ে অনড় রয়েছেন শিক্ষকরাও। চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
জানতে চাইলে চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, উভয়পক্ষ এভাবে অনড় থাকলে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হবে। শিক্ষকরা ক্লাশ নিতে আগ্রহী, তবে এর জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান দ্রুত এলে বন্ধের পরেই ক্লাশ শুরু করা সম্ভব হবে।
এদিকে যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরাফাত রহমানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য অবরুদ্ধ থাকার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত একমাত্র শিক্ষক ছিলেন।
মঙ্গলবার রাতে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে দেওয়া বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, অধ্যাপক আরাফাত রহমানের প্রত্যক্ষ মদদে ক্যাম্পাসের হৃৎপিণ্ড ভিসি ভবনের মতো জায়গায় যখন চিহ্নিত ও বহিষ্কৃত সন্ত্রাসীরা প্রবেশ করে, তখন তা ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সুষ্ঠু পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তার এমন আচরণ চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কখনই মেনে নেবে না।



