‘ঘুম ভাঙতেই আগুন জ্বলার মতো শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। দরজা খুলে বাইরে বের হতেই মুখে আগুনের তাপ অনুভব করি। মুহূর্তের মধ্যে ঘর ধোঁয়ায় ভরে যায়। বাইরে আগুনের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। আমাদের রুমটি ছিল রিসোর্টের দোতলায়। কোনোভাবে একটা জানালা ভেঙে বাইরে লাফ দিয়েছিলাম।
আজ শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন থেকে বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন আশিকুল ইসলাম। ওই অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন মারা গেছেন বলে দুপুরে নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে বসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।
ছুটি কাটাতে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন আশিকুল। গত বৃহস্পতিবার সকালে তারা কক্সবাজার পৌঁছে উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। শুক্রবার রাতে তাদের একজন কক্সবাজার থেকে ফিরে যান।
আজ সকাল ১০টায় বাকিদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই সকালে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ওই সময় রিসোর্টটিতে তারা নয়জন ছিলেন। আশিকুলসহ মোট তিনজন এ ঘটনায় বেঁচে ফিরেছেন।
মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় এখনো তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ।
আশিকুল জানান, রুম থেকে লাফিয়ে পড়ার প্রায় ১০ মিনিট আগে তার স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (২৮) তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেন। এরপর পরিবারের অন্য সদস্যদের সতর্ক করতে পাশের রুমের দিকে যান মালিহা। সেটিই ছিল স্ত্রীর সঙ্গে তার শেষ দেখা।
আশিকুল বলেন, ‘আর এক মিনিট থাকলে দম বন্ধ হয়ে আমিও মারা যেতাম।
আশিকুলের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ছয়জন হলেন—তার স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলা (২৬), খালাতো শ্যালিকা মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), শ্যালিকা ফারিহা কবির (৩৩) এবং তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফাইজান আহমেদ ও আশিকুলের খালাতো শ্যালক মো. নাফিস তেহামী (২৬)।
লায়লা জাহান নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) রসায়ন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য জানান জবি শিক্ষার্থী ও খালাতো ভাই আবদুল আহাদ সরকার।
এ ছাড়া, নাফিস তেহামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী। জনসংযোগ দপ্তরের দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ঢাবি।
আশিকুল জানান, ফারিহার স্বামী ইফতি আগের রাতে চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
আশিকুলের মামাশ্বশুর মাসুদ ও তার স্ত্রী নীলাও কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে বিকেল পৌনে ৪টার একটি ফ্লাইটে তাদের তিনজনকে ঢাকায় নিয়ে যান স্বজনরা।
আজ দুপুর ২টার দিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সদর হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের দেখতে যান। এ সময় আশিকুল তাকে নিখোঁজ স্বজনদের পরিচয় জানান।
জেলা প্রশাসক বলেন, তাদের নাম-পরিচয় সংগ্রহ করা হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্বজনদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
আজ সকাল সাড়ে ৬টার দিকে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
মৃতদের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ প্রতিবেদন তৈরিতে ঢাবি ও জবি সংবাদদাতা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।



