ফকির লালন শাহের মৃত্যুর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়েছে। কুষ্টিয়ায় তার আখড়াবাড়ির অধিকার নিয়ে কয়েক দশক ধরে আইনি লড়াই চলছে। এর মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তা হলো লালন সাঁইয়ের দর্শন ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার কে সংরক্ষণ করবে?
দীনহীন ও গৃহহীন অবস্থায় কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় এসেছিলেন ফকির লালন শাহ। বসন্তরোগে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী এই যুবককে কালীগঙ্গা নদীর তীর থেকে উদ্ধার করেছিলেন তাতি মলম প্রমাণিক ও তার স্ত্রী মতিজান বিবি। তাদের সেবাশুশ্রূষায় সুস্থ হয়ে ওঠেন লালন। পরে মলম প্রমাণিক তার পালক পিতা হন।
সেই থেকেই এমন এক আধ্যাত্মিক জগতের সৃষ্টি হয়, যা জাতপাত, ধর্ম ও জাতীয়তার গণ্ডি পেরিয়ে যায়। কথার মালা গেঁথে লালন সাঁইজি গেয়েছেন মানবতার গান। তিনি বলেছেন জাতপাতহীন এক সমাজ ব্যবস্থার কথা। মানুষে খুঁজেছেন ঈশ্বর। তার এই দর্শন আজও দেশ-বিদেশের লাখো-কোটি ভক্ত ও অনুরাগী অনুসরণ করেন।
তবে এই আধ্যাত্মিক গুরুর মৃত্যুর ১৩৬ বছর পর একটি প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে: লালন শাহের এই বিশাল আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করার অধিকার কার? তার আখড়াবাড়ির ভবিষ্যৎ কার হাতে থাকা উচিত?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিতর্ক জোরালো হলেও লড়াইটা নতুন নয়। দীর্ঘকাল ধরে লালন সাঁইজির আখড়াবাড়ি এখন ‘লালন মাজার শরিফ’ হিসেবে পরিচিত। লালনের অনুসারীদের দাবি, পাকিস্তানি আমলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপেই এই পরিবর্তন ঘটেছে। দানবাক্সের চাবি ও আখড়াবাড়ির ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় প্রশাসনের হাতে।
ফকির ও সাধুগুরুরা জানান, নিজস্ব আচার ও রীতিনীতি পালনের স্বাধীনতা হারিয়ে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ভিন্ন পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। তবে অনুসারীদের একটি অংশ ‘লালন মাজার শরিফ ও সেবা সদন কমিটি’র ব্যানারে নিজেদের অধিকার আদায়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রায় চার দশক ধরে আখড়াবাড়ির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এই কমিটি। জেলা আদালত ও হাইকোর্টে তারা নিজেদের পক্ষে রায় পেয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও প্রতিপক্ষের লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছেন।
তবে কমিটির দাবি, আইনি লড়াইয়ে জয় পেলেও আখড়াবাড়ির অধিকার এখনো তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘লালন একাডেমি’ এখনো এই জায়গার পুরো কর্তৃত্ব ভোগ করছে। দানবাক্সের অর্থ, মেলার মাঠ ও দীঘি ইজারা দেওয়ার বিষয়টিও প্রশাসনই দেখভাল করে।
সম্পত্তির অধিকারের বাইরেও এই বিতর্কের কেন্দ্রে একটি গভীর প্রশ্ন রয়েছে: যুগ যুগ ধরে যে সাধকরা লালনের দর্শন বহন করে আসছে, তাদের ছাড়া কি এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রচার সম্ভব?
লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ির স্বত্ব ঘোষণা চেয়ে লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারি বাদী হয়ে ১৯৮৫ সালের ১ জানুয়ারি দেওয়ানি মামলাটি রজু করেন।
১৯৯০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার সাব-জজ আদালত বাদীদের পক্ষে রায় দেন। রায়ে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তিতে তাদের স্বত্ব, স্বার্থ ও দখলের অধিকারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
পরে ওই বছরেই বিবাদীদের মধ্যে মো. আব্দুস সাত্তার ও মো. ছামছুদ্দিনসহ চারজন জেলা জজ বরাবর আপিল করেন।
১৯৯৬ সালের ৩০ নভেম্বর জেলা জজ নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠান। এই রায়ের ফলে সাধুগুরুরা আবারও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ছিটকে পড়েন।
এরপর জেলা জজের রায়ের বিরুদ্ধে ১৯৯৭ সালে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করে কমিটি।
২০০১ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি এম এ ওয়াহাব মিয়া কমিটির পক্ষে রায় দেন। তিনি জেলা জজ আদালতের রায় বাতিল করে বিচারিক আদালতের রায় ও ডিক্রি পুনর্বহাল করেন।
২০০২ সালে বিবাদীরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেন। এর মাধ্যমে আইনি লড়াইয়ে সাধুগুরুদের পক্ষেই চূড়ান্ত রায় আসে।
কমিটির তথ্যমতে, আগের বিচারিক কার্যক্রমে লালন একাডেমি বিবাদীদের তালিকায় থাকলেও তারা আপিলে অংশ নেয়নি। এত কিছুর পরও কমিটি জানায়, তারা এখনো আখড়াবাড়ির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি।
১৮৯০ সালে লালনের মৃত্যুর পর তার স্মৃতি সংরক্ষণ ও সম্পত্তির দেখাশোনার জন্য ‘লালন শাহ আখড়া কমিটি’ গঠিত হয়। এই কমিটি থেকেই বর্তমান ‘লালন মাজার শরিফ ও সেবা সদন কমিটি’র উৎপত্তি।
১৯৬৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খানের সরাসরি হস্তক্ষেপে কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘লালন শাহ মাজার শরিফ’ রাখা হয়। সাধুগুরুরা এই পরিবর্তনকে লালনের দর্শনের ওপর ধর্মীয় পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, লালনের দর্শন প্রচলিত ধর্মীয় গণ্ডির অনেক ঊর্ধ্বে।
পরে ১৯৮৩ সালে সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৎকালীন সভাপতি আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহের স্বাক্ষরে সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে ‘লালন মাজার শরিফ ও সেবা সদন কমিটি’ রাখা হয়।
বর্তমান কমিটি আশা করে, আইনি জটিলতা কেটে গেলে তারা আবার নিজেদের পুরোনো নাম ‘লালন আখড়াবাড়ি কমিটি’ ফিরে পাবে।
কমিটির সভাপতি আলী আহসান তুফান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা করুণা চাচ্ছি না৷ সুপ্রিম কোর্টের রায় রয়েছে। আমরা চাই রায় বাস্তবায়ন হোক। এখানে যে ফকিরি ঘরানা, যেখানে মানুষ তৈরি হয়, সেই জায়গাটা মানুষের জন্য উন্মুক্ত হোক। লালন একাডেমি, লালন একাডেমির জায়গায় থাকুক, প্রশাসন তাদের কাজ তারা করুক। আমরা আমাদের কাজ করি।
তুফানের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা সম্পত্তির মালিকানার বিষয় নয়। এটি লালনের জীবন্ত ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।
তিনি বলেন, ‘বাইরের দেশের মানুষ এখানে এসে কী নেবে? এখানে তো ফকির থাকতে হবে। গবেষণাগার থাকতে হবে। কথা বলার জায়গা থাকতে হবে। একজন মানুষ তো এসে ফকিরদের জীবন দেখবে। জানতে হবে ফকিরের ঝোলায় কী আছে! কিন্তু এখানে এসে মানুষ দেখছে কিছু কবর ও ভুলভাল ইতিহাসের জাদুঘর। লালনের প্রচারে এসব কোনো কাজে আসছে না।
তিনি মনে করেন, লালনের ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সাধক সম্প্রদায়কে দূরে সরিয়ে রাখলে এটি একসময় শুধু কিছু স্মৃতিচিহ্ন ও ঐতিহাসিক জাদুঘরে পরিণত হতে পারে।
লালন একাডেমির প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস এই বিতর্কের আরেকটি দিক তুলে ধরে।
১৯৬৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ‘লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৬৫ সালে সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘লালন একাডেমি’। ১৯৭৮ সালে স্থানীয় প্রশাসন এর নিয়ন্ত্রণ নিলে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।
১৯৯৮ সালে সরকারি উদ্যোগে একাডেমির চারতলা ভবনের পাশাপাশি একটি দোতলা মিলনায়তন নির্মাণ করা হয়। ভবনের নিচতলায় লালনের জীবদ্দশায় ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র রাখা আছে। আর দ্বিতীয় তলায় রয়েছে লালনের দর্শন নিয়ে গবেষক ও লেখকদের বইসমৃদ্ধ একটি পাঠাগার।
ফকির লালন সাঁইয়ের দর্শন প্রচারে একাডেমি কী উদ্যোগ নিয়েছে, জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসান সাংবাদিকদের বলেন, লালন সাঁইয়ের দর্শন প্রচারে একাডেমি বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘লালনের বাণী প্রচারের জন্য একাডেমি নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রশিক্ষণার্থীদের লালনের গান, বাণী ও কালাম শিক্ষা দেওয়া হয়। দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, গবেষক ও চিন্তাবিদদের নিয়ে সেমিনার আয়োজন ও লালন চিন্তাকে প্রকাশনার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
কমিটির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া চলমান। তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়নের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ আছে কিনা? উত্তরে জেলা প্রশাসক বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়নের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
লালনের উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করবে কে?
লালন গবেষক, লেখক ও আইনজীবী লালিম হকের মতে, উত্তরাধিকারের এই প্রশ্নটি লালনের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এক কথায় যদি বলি, বাউল সংগঠন বাউলরাই করবে। এটা গুরুবাদী সংগঠন, মর্মবাদী সংগঠন। এখানে আমার তোমার জায়গা নেই। গুরুবাক্য মানো ও প্রতিষ্ঠা করো।
লালিম হক মনে করেন, আদালতের মাধ্যমে সাধুগুরুরা ইতোমধ্যেই নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং কর্তৃপক্ষের উচিত এই রায়কে সম্মান জানানো।
তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায় হয়েছে। সারা জীবন কষ্ট করে মানুষ যেমন অর্জন করে, তেমন ফকিররা অর্জন করেছে তাদের রায়। লালন সাঁই বাউলদের লোক। বাধ্য থাকবেন আইন ও প্রশাসন তাদের কাগজপত্র সমেত সসম্মানে লালনের কবরের কাছে, লালনের পায়ের কাছে ঠাঁই দেওয়ার জন্য। তারা কেন করছেন না আমি বুঝি না। আইনের প্রতি এত অবজ্ঞা কখনোই ভালো নয়।
লালিম হক বিশ্বাস করেন, একদিন না একদিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবেই। তবে দীর্ঘ অবহেলার কারণে চূড়ান্ত সমাধান প্রক্রিয়াটি লালনের স্মৃতির জন্য বেদনাদায়ক হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এ বিষয়ে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার মনে করেন, লালন সাঁইয়ের উত্তরাধিকার সাধুগুরুদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। তবে এজন্য সাধুগুরুদের ঐক্য জরুরি বলে জানান তিনি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, লালন একাডেমিকে গবেষণা ইনস্টিটিউট বানাতে হবে। আর ফকির সাধুগুরুদের ধাম ছেড়ে দিতে হবে।
ফকির লালন সাঁইয়ের সময় নদীয়ায় পাঁচটি আধ্যাত্মিক ধারা ছিল। লালন সাঁই নিজে তার সমসাময়িক এই ঘরানাগুলোকে বিশেষ মান্যতা বা স্বীকৃতি দিতেন। এই বিখ্যাত পাঁচ ঘর মূলত যারা পরিচালনা করতেন তারা হলেন: ছেঁউড়িয়ার ঘর বা লালন সাঁইজির ঘর, ঝিনাইদহের হরিশপুরের মরমী সাধক খোন্দকার পাঞ্জু শাহের ধারা, পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণীর ঘোষপাড়ার সতী মার ঘর, কুষ্টিয়া অঞ্চলের অন্যতম সাধক চৌধুরীর ঘর ও আধ্যাত্মিক সাধক দেলবার সাঁইয়ের অনুসারীদের ঘর।
ফরহাদ মজহার বলেন, এই পাঁচ ঘরের মানুষের হক আছে লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়িতে। সবাই মিলে সরকারকে ধরলে একটা সমাধান হবে। তবে তার আগে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ফকির সাধুগুরুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া।



