‘সীবিচে আছি, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরব। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেয়ো।’ গত শুক্রবার রাতে ছোট ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিনের সঙ্গে এটাই ছিল শেষ কথা। এরপর থেকে ছেলের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না অশীতিপর মতিয়ার রহমান। এখন কী করবেন, তা-ও বুঝে উঠতে পারছেন না এই মা।
কথাগুলো বলার পর নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন যশোরের মনিরামপুর পৌরসভার মোহনপুর কারিকরপাড়ার বাসিন্দা মতিয়ার রহমান।
কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন তার ছোট ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), পুত্রবধূ আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং দুই নাতনি রুজাইনা ইনায়া (৮) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
মতিয়ার রহমান বলেন, ছোট ছেলের সঙ্গে ঢাকায় থাকি। মাস দেড়েক আগে গ্রামে এসেছি। বুধবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার রাতেও কথা হয়। সবাইকে নিয়ে বিচে আনন্দ করছিল। ওদের সঙ্গে আর কথা হবে না...।
নিখোঁজ নাহিদের চাচাতো ভাই ও প্রতিবেশীরা জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছেন নাহিদ। রাজধানীর শ্যামলীতে ‘গ্র্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। পরিবার নিয়ে থাকতেন মিরপুরে। গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারের ওই রিসোর্টে বুকিং দিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন তারা।
নাহিদের ফুফু রোকসানা আক্তার রূপালী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার বাজান মারা গেছে, আমি বিশ্বাস করি না। এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি তাদের মৃত্যুর বিষয়। তারা হয়তো কোথাও আছে।
সবশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। তবে বাকি চারজনের শরীর সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
নিখোঁজ নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকে ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই ভাতিজির আর কোনো খোঁজ মিলছে না। তারা আগুনে পুড়ে যাওয়া অজ্ঞাতপরিচয়ের লাশগুলোর মধ্যে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে তিনি সিলেট থেকে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন।
তিনি বলেন, যে চারটি লাশ রয়েছে, তার মধ্যে দুটি শিশুর। তবে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারছি না। চেহারা চেনার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। আহতদের মধ্যেও আমার ভাই ও তার স্ত্রী নেই। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এর বেশি আর কিছু বলতে পারব না।
তিনি আরও জানান, টুপটুপ রিসোর্টের মেমো থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বুকিং দিয়েছিলেন নাহিদ।
নাহিদের চাচা খালিদুর রহমান বলেন, ঢাকার কর্মস্থল ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন সূত্রে যোগাযোগের পর নিশ্চিত হওয়া গেছে, নিখোঁজ চারজনের পরিচয় এখনো পুলিশ বা প্রশাসন শনাক্ত করতে পারেনি। পুড়ে যাওয়া চারটি লাশের ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
একটি পরিবার এভাবে এক নিমেষে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মনিরামপুরের মোহনপুর কারিকরপাড়াজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন ও প্রতিবেশীদের চোখের পানিতে ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ। সকাল থেকেই স্থানীয় লোকজন ভিড় করছেন নাহিদের গ্রামের বাড়িতে।
জানতে চাইলে মনিরামপুর থানার ওসি আবু সাঈদ বলেন, নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। যতটুকু জানা গেছে, নাহিদের পরিবারের লাশ শনাক্ত হয়নি। যে লাশগুলো রয়েছে, সেগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা যাবে না।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা একে একে ১০টি লাশ উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন।
আগুন থেকে বাঁচতে কাঠের অবকাঠামোয় নির্মিত রিসোর্টটির শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি চারজন। সেখান থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।



-6ad485466c917.jpg)