সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
১১ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

প্লাস্টিক বর্জ্যও যে চিড়িয়াখানার প্রবেশ টিকিট

প্লাস্টিক বর্জ্যও যে চিড়িয়াখানার প্রবেশ টিকিট...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৭ পিএমসর্বশেষ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৭ পিএম
প্লাস্টিক বর্জ্যও যে চিড়িয়াখানার প্রবেশ টিকিট

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার টিকিট কাউন্টারে কাগজের টাকার পরিচিত খসখস শব্দের পাশাপাশি ইদানীং কানে আসছে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট আর পলিথিনের শব্দ।

এগুলো কোনো অসচেতন দর্শনার্থীর ফেলে যাওয়া ময়লা নয়; বরং টিকিট কেনার নতুন 'মুদ্রা'।

গত সেপ্টেম্বর থেকে আচরণগত পরিবর্তনের এক নীরব অথচ গভীর উদ্ভাবনী উদ্যোগ চালিয়ে আসছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। পরিবেশসচেতনতামূলক বিশেষ এই কর্মসূচির আওতায় ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোররা ১০০ গ্রাম পরিমাণ ব্যবহৃত প্লাস্টিক জমা দিলেই পেয়ে যাচ্ছে ৭০ টাকা প্রবেশমূল্যের চিড়িয়াখানার টিকিট।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইমুল হক প্লাস্টিক সংগ্রহ করার বিষয়টিকে হাতখরচ বাঁচানোর বুদ্ধি নয়, বরং নতুন কিছু উপলব্ধির সুযোগ হিসেবে দেখছে।

চিড়িয়াখানার কাউন্টারের দিকে যাওয়ার আগে কোমল পানীয়ের খালি বোতলভর্তি একটি ব্যাগ হাতে নাইমুল জানায়, ‘শুরুতে আমি আর আমার বন্ধুরা ভেবেছিলাম এটা বিনামূল্যে চিড়িয়াখানায় প্রবেশের একটা দারুণ উপায়। কিন্তু যখন পাড়ার গলি আর স্কুলের মাঠ থেকে বোতল কুড়ানো শুরু করলাম, তখন বুঝলাম কত প্লাস্টিক চারপাশে পড়ে থেকে আমাদের শহরটাকে নষ্ট করছে। আজকে এটা জমা দিয়ে টিকিট নেওয়ার পর মনে হচ্ছে টাকা দিয়ে নয়, বরং শহরের কিছুটা ময়লা পরিষ্কার করে আমি নিজের যোগ্যতায় এই টিকিটটা অর্জন করেছি।

একই অনুভূতির কথা জানায় দশম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বিপ্লব দাস। কীভাবে এ উদ্যোগ তার প্রতিদিনকার অভ্যাসে পরিবর্তন এনেছে, তা উল্লেখ করে সে বলে, ‘সাধারণত আমরা কোমল পানীয় খেয়ে দ্বিতীয়বার না ভেবেই বোতলটা ফেলে দিই। কিন্তু এখন কোনো প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেট দেখলে দুবার ভাবি। আমার ফেলে দেওয়া আবর্জনা পরিবেশের ক্ষতি না করে পুনর্ব্যবহার (রিসাইকেল) হবে—এটা ভেবে চিড়িয়াখানায় পশুপাখি দেখতে যাওয়ার অনুভূতিটাই অন্যরকম হয়ে গেছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই এই প্রবেশমূল্য দেওয়াটা হয়তো কঠিন কিছু নয়। কিন্তু নিজে প্লাস্টিক কুড়িয়ে, ব্যাগে ভরে গেট পর্যন্ত নিয়ে আসার বিষয়টি তাদের প্লাস্টিকের কুপ্রভাব হাতেকলমে অনুধাবন করায়। এটি তাদের পরিবেশ ও সমাজের ওপর মানুষের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

শিশু-কিশোরদের চিন্তাভাবনা গড়ে ওঠার সময়েই তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কর্মসূচিটি চালু করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে বসে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে বক্তৃতা শোনানোর পরিবর্তে শিশুদের সরাসরি সমস্যাটির মুখোমুখি করা হচ্ছে, যাতে তারা সমাধানের অংশ হওয়ার সুযোগ পায় বলে জানান তিনি।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে, গত ১ সেপ্টেম্বর কর্মসূচি শুরুর পর প্রায় দুই মাসে চার শতাধিক শিশু-কিশোর তাদের কুড়িয়ে আনা প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে চিড়িয়াখানায় সুন্দর একটি দিন কাটানোর সুযোগ পেয়েছে।

তবে এই সাফল্য প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নতুন এক চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রবেশদ্বারে রঙিন প্লাস্টিকের স্তূপ জমতে থাকায় পরিবেশগত এক বিপরীতমুখী শঙ্কার সৃষ্টি হয়।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার কিউরেটর ড. শাহাদাত হোসেন শুভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রায় দুই মাস ধরে আমরা চিন্তায় ছিলাম। একটা শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমরা প্লাস্টিক জমাই ঠিকই, কিন্তু সেই প্লাস্টিক যদি আবার কোনো ল্যান্ডফিলে কিংবা প্রকৃতিতেই গিয়ে পড়ে, তবে যে দূষণের বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি, ঘুরেফিরে আমরা তো সেটাই বাড়িয়ে দেব।

তবে আজ সোমবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে সেই দুশ্চিন্তার অবসান ঘটে। অনাড়ম্বর এক আয়োজনের মধ্য দিয়ে জেলা প্রশাসন এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এন্টারপ্রাইজের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়।

এক বছর মেয়াদি এ সমঝোতায় কোনো আর্থিক লেনদেনের শর্ত নেই। এই চুক্তির আওতায় ইপসা নিয়মিত চিড়িয়াখানার গেটে জমা হওয়া প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে রিসাইকেল করার দায়িত্ব নেবে। এতে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার চক্রটি পুরোপুরি সম্পন্ন হলো।

কর্মকর্তারা মনে করছেন, চট্টগ্রামে প্রতিদিন যে পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়, তার তুলনায় এ অংশীদারত্বের পরিধি হয়তো অনেক কম। তবে উদ্যোগটি ভবিষ্যতে প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, এই উদ্যোগটি এরই মধ্যে চিড়িয়াখানার সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোন আসছে। এই মডেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কীভাবে নিজেদের এলাকায় প্লাস্টিক সংগ্রহ অভিযানের আয়োজন করা যায়, সে বিষয়ে জানতে চাইছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অবশ্য সামনের পথটা এখনও পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জে ভরা। উন্নয়নশীল বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের মতোই বাংলাদেশও পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য রিসাইক্লিং অবকাঠামোর সংকটে ভুগছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা স্বীকার করি, রাতারাতি প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমাদের সঠিক ব্যবস্থাপনা, রিসাইক্লিং ও নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। সবাই যদি সততার সঙ্গে প্লাস্টিক সংগ্রহ শুরু করে, তবে আমি বিশ্বাস করি—ভবিষ্যতে এটি একটি বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।

বিকেলের রোদ যখন চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার খাঁচার দেয়ালের আড়ালে মিলিয়ে যায় আর দিনের শেষ দর্শনার্থী শিক্ষার্থীরা বাড়ির পথে রওনা হয়, তখন টিকিট কাউন্টারের পেছনে রাখা বিনগুলো প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরে ওঠে। তবে এসব বর্জ্য এবার আর শুধু পচে যাওয়ার অপেক্ষায় পড়ে থাকবে না; বরং শিগগিরই সেগুলো নতুন করে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠবে।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ