বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
১৪ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

খুলনায় বেপরোয়া অস্ত্রধারীরা, ১০ মাসে ৭১ হত্যা

খুলনায় বেপরোয়া অস্ত্রধারীরা, ১০ মাসে ৭১ হত্যা...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৩ এএমসর্বশেষ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
খুলনায় বেপরোয়া অস্ত্রধারীরা, ১০ মাসে ৭১ হত্যা

খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় তিনবার গুলির ঘটনা ঘটেছে, গুলিবিদ্ধ হয়েছেন যুবদলের দুই নেতা। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ও তার আগের রাতে বটিয়াঘাটায় পৃথক ঘটনায় গুলি করা হয় দুই যুবদল নেতাকে। এছাড়া, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে গুলি করে ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।

অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চললেও গুলি, হত্যা ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা থামছে না সেখানে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় ৭১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ছিনতাই, ব্যক্তিগত বিরোধ ও চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) আওতাধীন ৮ থানায় ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন।

জেলা পুলিশের আওতাধীন ৯ থানায় মামলা হয়েছে ৩৫টি। সব মিলিয়ে ৬৯টি মামলায় নিহত হয়েছেন ৭১ জন। অর্থাৎ, গড়ে প্রায় প্রতি চার দিনে একটি করে হত্যা মামলা হয়েছে।

কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, নগরে ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই মামলার সংখ্যা ৩৪।

জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি এবং ২০২৫ সালে ৪৯টি হত্যা মামলা হয়। চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩৫টি।

খুলনা নগরে এ বছর সবচেয়ে বেশি ৮টি হত্যা মামলা হয়েছে সদর থানায়। লবণচরায় ৭টি, দৌলতপুরে ৫টি, আড়ংঘাটায় ৪টি, হরিণটানা ও খালিশপুরে ৩টি করে এবং সোনাডাঙ্গা ও খানজাহান আলী থানায় দুটি করে মামলা হয়েছে।

মহানগরের বাইরে রূপসায় সর্বোচ্চ ১২টি মামলা হয়েছে। দিঘলিয়া ও পাইকগাছায় ৫টি করে, কয়রায় ৪টি, ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটায় ৩টি করে, তেরখাদায় দুটি এবং ফুলতলায় একটি মামলা হয়েছে। দাকোপে কোনো হত্যা মামলা হয়নি।

হত্যাকাণ্ডের বাইরে জেলায় অন্তত ৩০টি হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে বলেও পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পুলিশের ভাষ্য, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য কারণ।

গত ১৯ আগস্ট নগরের লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রায় ১০০ গজ দূরত্বের মধ্যে নিহত হন মঞ্জুরুল ইসলাম (২৩) ও নাজমুল (১৮)। তাদের দুজনকেই গুলি করার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মাদক কারবার ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের সহিংস রূপ সামনে আসে। অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ শুধু নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, সাধারণ মানুষও এসব সংঘাতের শিকার হচ্ছেন।

গত ২২ অক্টোবর ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সকালে পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় তাওহিদুল ইসলামকে। একইদিন সন্ধ্যার পর জিন্নাহপাড়ায় বাড়ির কাছে গুলিতে নিহত হন গৃহবধূ খুশি আক্তার।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দুটি ঘটনার পেছনেই মাদক-সম্পর্কিত বিরোধ থাকতে পারে। হত্যাকাণ্ড দুটির মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, নগরীতে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, নূর আজিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, টেংকি শাওন গ্রুপসহ কয়েকটি অপরাধী গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।

এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র কারবার, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। জমি, মাছের ঘের, বালুর ব্যবসা, পরিবহন ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও কোথাও কোথাও বিরোধ তৈরি হচ্ছে।

পুলিশের তথ্য মতে খুলনা নগর এবং জেলার বিভিন্ন জায়গায় বি-কোম্পানির প্রায় ৮ শতাধিক সদস্য রয়েছে যারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাদক, চাঁদা, জমি দখল এমনকি ভাড়াটে খুনি হিসেবে তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযানে যান।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নূর আজিম ও গ্রেনেড বাবু গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করেও চাঁদাবাজি করছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

জেলায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার শুধু হত্যাকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। ভয় দেখানো, ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানো এবং ছিনতাইয়ের সময় গুলি চালানোর ঘটনা ঘটছে।

গত ১৮ অক্টোবর রাতে নগরের পশ্চিম টুটপাড়া আমতলা মোড়ে শেখ জুম্মান রহমান নামের এক যুবককে গুলি করে তার মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।

৩ জুলাই রূপসার নতুন বাজার বেড়িবাঁধ সড়কে গুলিবিদ্ধ হয় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। ২ জুলাই আশিবিঘা এলাকায় গুলিতে আহত হন রাতুল শেখ (২২)।

২৪ অক্টোবর নগরের টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় নিজ দোকানে গুলিবিদ্ধ হন আকাশ কুণ্ডু (৪৫)। চাকরির পাশাপাশি তিনি দোকান পরিচালনা করেন।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, তাকে ভয় দেখানোর জন্য গুলি করা হতে পারে। ঘটনার পেছনে চাঁদাবাজির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এছাড়া, গত ১৯ মার্চ লবণচরার কৃষ্ণনগরে শেখ রাশেদুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তার বাবা-মা, ভাই ও স্ত্রীকে গুলি করে আহত করে দুর্বৃত্তরা। এর প্রায় আড়াই মাস পর, ২ জুন রাশেদুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নগরে ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৩৩টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অস্ত্রের মধ্যে ৩০টি বিদেশি পিস্তল ও ৭টি বিদেশি রিভলবার রয়েছে। এসব ঘটনায় অস্ত্র আইনে ৪৩টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭৫ জন।

জেলা পুলিশ একই সময়ে ২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৩টি গুলি উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় ১৮টি মামলা হয়েছে এবং ৩৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। নগর ও জেলায় মোট ৭৬টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ ঠেকানো না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। দেখা গেছে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর অনেকগুলো একই ধরনের এবং বেশিরভাগই ভারতে তৈরি বলে তাদের ধারণা। অস্ত্রগুলো সচল অবস্থায় পাওয়া গেছে।

নগরীজুড়ে এখনো কয়েকশ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকতে পারে বলে গোয়েন্দা পুলিশের অনুমান।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাদক কারবারে যুক্ত কিছু গোষ্ঠী বিক্রেতা ও সহযোগীদের মোটরসাইকেল, মাসিক বেতন, কমিশন ও অস্ত্রের জোগান দেয়। মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা দ্রুত সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়।

তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া শুধু পুলিশের পক্ষে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহ-সভাপতি গৌরাঙ্গ নন্দী সাংবাদিকদের বলেন, খুলনা একসময় শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন একের পর এক হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মাদক কারবার বন্ধ হয়নি। বরং এর বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ সহিংসতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

যোগাযোগ করা হলে কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান বলেন, সব ঘটনার পেছনে একই কারণ নেই। কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, কোথাও ছিনতাই, আবার কোথাও মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতটাই নাজুক অবস্থায় চলে গেছে যে পুলিশকে রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গত ২৩ অক্টোবর রাতে জেলা বিশেষ শাখার (এসবি) পুলিশ সুপারের সই করা একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।

জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক অবশ্য বলেছেন, 'আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে নয়, বরং পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।'

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ