টিন (টিআইএন) সনদ নেওয়ার পর অনেকেই আর আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। কেউ বাড়ি, গাড়ি বা ব্যাংকিং-সংক্রান্ত প্রয়োজনে টিন খুলেছেন, আবার কেউ বিভিন্ন কারণে এটি নেওয়ার পর ব্যবহার করেননি। পরে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এসে জানতে পারেন, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দেওয়ায় অতিরিক্ত কর বা জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে রিটার্ন জমা দেওয়া বন্ধ না রেখে বিলম্ব রিটার্নের নিয়ম জানা জরুরি। বাংলাদেশের আয়কর আইনে নির্ধারিত সময়ের পরও রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কখন রিটার্ন জমা দেওয়া হচ্ছে, করদাতা আগে রিটার্ন দিয়েছেন কি না এবং কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পেয়েছেন কিনা—এসব বিষয়ের ওপর অতিরিক্ত করের হিসাব নির্ভর করতে পারে। দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে কিছু কর অব্যাহতির সুবিধাও হারানোর আশঙ্কা থাকে।
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর যে রিটার্ন জমা দেওয়া হয়, তাকে বিলম্ব রিটার্ন বলা হয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭৪ ধারায় এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের অর্থ আইনে এই ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিধানে উল্লেখ রয়েছে।
তবে নির্ধারিত সময় পার হলেই সব করদাতার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হয় না। করদাতার ধরন, রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান অনুযায়ী করের হিসাব নির্ধারিত হয়।
কারা বিলম্ব রিটার্ন দেবেন?
যাদের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক, অথচ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা দেননি, তাদের বিলম্ব রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে।
আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেই রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা ও আইনি শর্ত বিবেচনা করতে হবে।
২০২৬-২৭ করবর্ষে কখন রিটার্ন দিলে কী হবে?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭০ ধারায় ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের জন্য সময়ভিত্তিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখানে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় অনুসারে কর প্রণোদনা বা অতিরিক্ত করের কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব সময়সীমা ও হিসাব প্রয়োগের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট করদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান যাচাই করা জরুরি। আগে কখনো রিটার্ন জমা দেননি—এমন করদাতা এবং বিদেশে অবস্থানরত নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতাদের জন্য বিশেষ বিধান থাকতে পারে।
করবর্ষ শেষ হওয়ার পর রিটার্ন দিলে কত বাড়তি কর?
করবর্ষ শেষ হওয়ার পরও রিটার্ন জমা না দিলে আয়কর আইনের ১৭৪ ধারার আওতায় অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কারও পরিশোধযোগ্য কর ২০ হাজার টাকা হলে তার ১০ শতাংশ দাঁড়ায় ২ হাজার টাকা। কিন্তু ন্যূনতম অতিরিক্ত কর ৫ হাজার টাকা হলে তাকে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে মূল করসহ মোট দিতে হবে ২৫ হাজার টাকা—অন্য কোনো কর বা দায় না থাকলে।
মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত করের এই হিসাব সব করদাতার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট করবর্ষের কার্যকর আইন, বিশেষ বিধান ও কর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই করতে হবে।
দেরিতে রিটার্ন দিলে কি কর ছাড় পাওয়া যাবে?
বিলম্ব রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া কিছু কর অব্যাহতি বা কর-সুবিধা পাওয়া নাও যেতে পারে। ফলে সময়মতো রিটার্ন জমা দিলে যে সুবিধা পাওয়া যেত, দেরিতে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে তা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুধু অতিরিক্ত কর নয়, করযোগ্য আয় ও মোট করের হিসাবেও পার্থক্য হতে পারে।
টিন বাতিল করতে চাইলেও কি রিটার্ন দিতে হবে?
টিন সনদ নেওয়ার পর আর প্রয়োজন না হলে সেটি বাতিলের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে টিন বাতিল করলেই আগের করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বা বকেয়া দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। বাতিলের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আগের রিটার্নের অবস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করা উচিত।
রিটার্ন জমা দিতে দেরি হয়ে গেলে আর অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করুন।
এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন পোর্টাল বা প্রযোজ্য দাখিল-পদ্ধতি অনুসরণ করে রিটার্ন জমা দিন। করের হিসাব জটিল হলে কর আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দেওয়া এবং করবর্ষ শেষ হওয়ার পর বিলম্ব রিটার্ন জমা দেওয়া এক বিষয় নয়। তাই নিজের করদাতার ধরন, রিটার্ন জমার সময়, আগের রিটার্নের অবস্থা এবং কোনো নোটিশ পেয়েছেন কি না—এসব যাচাই করে সঠিক নিয়মে রিটার্ন জমা দিন।



