আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সঞ্চয়পত্রের তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে, তা নিয়ে অনেক করদাতার মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে। সঞ্চয়পত্র কেনার অর্থ, সেখান থেকে পাওয়া মুনাফা এবং মুনাফার ওপর উৎসে কাটা কর—প্রতিটি তথ্যই সঠিকভাবে রিটার্নে উল্লেখ করা জরুরি। কোনো তথ্য বাদ পড়লে বা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে করসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় সঞ্চয়পত্রের তথ্য দেওয়ার নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে অনলাইন রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ ও মুনাফার তথ্য আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি, সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে কর কাটা হয়ে থাকলে সেই তথ্যও যথাযথভাবে সমন্বয় করতে হবে। সঞ্চয়পত্রের তথ্য কোথায় দেবেন, মুনাফার ওপর কর দিতে হবে কি না এবং বিনিয়োগে কর রেয়াত পাওয়া যায় কি না—এসব বিষয় জেনে নেওয়া যাক।
ই-রিটার্নে সঞ্চয়পত্রের তথ্য কোথায় দেবেন?
সঞ্চয়পত্রকে শুধু আয়ের উৎস হিসেবে দেখালে চলবে না। এটি করদাতার একটি আর্থিক সম্পদ। তাই আয়কর রিটার্নের ‘অ্যাসেট অ্যান্ড লায়াবিলিটিস’ (Assets and Liabilities) অংশে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ করতে হবে।
অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্র থেকে অর্জিত মুনাফা দেখাতে হবে ‘ইনকাম ফ্রম ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসেটস’ (Income from Financial Assets) অংশে। অর্থাৎ, সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য যে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা সম্পদ হিসেবে এবং সেখান থেকে পাওয়া মুনাফা আয় হিসেবে দেখাতে হবে।
এনবিআরের ই-রিটার্নসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, অনলাইনে কেনা সঞ্চয়পত্রের তথ্য ‘ইমপোর্ট ফ্রম এনএসডি’ (Import from NSD) অপশনের মাধ্যমে আনার সুযোগ রয়েছে। তবে ২০১৯ সালের ৩০ জুনের আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের তথ্য ম্যানুয়ালি দিতে হবে।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় কি আয়কর দিতে হয়?
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর সাধারণত উৎসে কর কাটা হয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১০৫ ধারা অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে।
তবে পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে বিশেষ সুবিধা রয়েছে। কোনো আয়বর্ষে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ লাখ টাকা অতিক্রম না করলে ওই বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর সংশ্লিষ্ট ধারায় উৎসে কর কর্তন করা হয় না।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পাওয়ার সময় উৎসে কর কেটে নেওয়া হলে রিটার্নে সেই করের তথ্যও উল্লেখ করতে হবে। এতে আগে পরিশোধ করা করের হিসাব সমন্বয়ের সুযোগ পাওয়া যায়। তবে উৎসে কর কর্তন করা হয়েছে বলেই সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত করদায় মিটে গেছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। করদাতার প্রযোজ্য কর হিসাব অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারিত হবে।
সঞ্চয়পত্র কিনলে কি কর রেয়াত পাওয়া যায়?
নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমা পূরণ সাপেক্ষে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত পাওয়া যেতে পারে। এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকায় নতুন সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকে কর রেয়াতযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রেয়াতের সুযোগ পেতে সংশ্লিষ্ট আইন ও নির্দেশনায় নির্ধারিত অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, কর রেয়াত মানে বিনিয়োগের পুরো অর্থ করযোগ্য আয় থেকে বাদ দেওয়া নয়। নির্ধারিত নিয়ম ও হিসাব অনুযায়ী কর রেয়াতের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
এ ছাড়া করদাতার করদায় না থাকলে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ থাকে না। আবার রেয়াত হিসাব করার পর করদায় শূন্য বা ঋণাত্মক হলেও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর দিতে হতে পারে।
সঞ্চয়পত্রের উৎসে কাটা কর কীভাবে সমন্বয় করবেন?
ই-রিটার্নে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার তথ্য দেওয়ার পর উৎসে কর্তিত করের হিসাবও সঠিকভাবে যুক্ত করতে হবে। এ জন্য কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।
প্রথমে ই-রিটার্নের ‘ট্যাক্স অ্যান্ড পেমেন্ট’ (Tax & Payment) অংশে যেতে হবে। এরপর ‘আপডেট ট্যাক্স পেমেন্ট স্ট্যাটাস’ (Update Tax Payment Status) অপশন থেকে ‘ই-রিটার্ন লেজার’ (e-Return Ledger) খুলতে হবে। সেখানে ‘ক্লেইম সোর্স ট্যাক্স’ (Claim Source Tax) অপশনে গিয়ে ‘সঞ্চয়পত্র’ (Sanchaypatra) নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।
অনলাইন সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে ‘ইমপোর্ট ফ্রম এনএসডি’ অপশন ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট তথ্য আনা যায়। এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, আমদানি করা তথ্যের সঙ্গে উৎসে কর্তিত বা সংগৃহীত করের বিবরণও যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী রিটার্নে যুক্ত করতে হবে।
সঞ্চয়পত্রের তথ্য রিটার্নে দেওয়ার সময় মূল বিনিয়োগ, অর্জিত মুনাফা এবং উৎসে কর্তিত করের হিসাবের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। কোনো তথ্য বাদ পড়েছে কি না, তা জমা দেওয়ার আগে যাচাই করে নেওয়া উচিত।
সঞ্চয়পত্রের মূল বিনিয়োগকে সম্পদ হিসেবে এবং সেখান থেকে পাওয়া মুনাফাকে আয় হিসেবে দেখাতে হবে। মুনাফার ওপর আগে কর কেটে নেওয়া হয়ে থাকলে সেই অর্থের তথ্যও উৎসে কর্তিত কর হিসেবে সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।
রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সঞ্চয়পত্রের সার্টিফিকেট, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরে (এনএসডি) থাকা তথ্য এবং উৎসে কর কর্তনের হিসাব মিলিয়ে নেওয়া ভালো। এতে সম্পদের সঠিক বিবরণ দেওয়া সহজ হবে এবং একই আয়ের বিপরীতে ভুল হিসাবের কারণে অতিরিক্ত কর পরিশোধের ঝুঁকিও কমবে।
সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ ও মুনাফার তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা বা কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।



