গত ২৭ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে পিকআপ ভ্যানচালক জনিকে (৩২) তার বন্ধু আরাফাত রাজধানীর কাজলা এলাকায় দেখা করার জন্য ফোন করেন।
সেখানে পৌঁছানোর পরই তাকে যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচার চার নম্বর গেটের কাছে একটি স্থানীয় ক্লাবে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একদল লোক তাকে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে বেধড়ক মারধর করে।
একই অভিযোগে সেখানে আরেক তরুণ নিশাতকেও মারধর করা হয়। ঘটনাস্থলেই জনির মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় নিশাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে পরদিন সকাল ৯টার দিকে তারও মৃত্যু হয়।
নিশাতের বোন শারমিন আক্তারের অভিযোগ, হারুন নামের স্থানীয় এক প্রভাবশালীসহ ৭-৮ জন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।সংবাদমাধ্যমকে শারমিন জানান, ঘটনার পর সেখানে গেলে তার বাবা মো. মহসিনকেও মারধর করা হয়। তিনি আরও জানান, আরাফাতই তার ভাই নিশাত ও জনিকে ডেকে নিয়েছিল।
শারমিনের দাবি, পূর্ব শত্রুতার জেরে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে।
'যারা আমার ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, আমরা তাদের শাস্তির দাবি জানাই,' বলেন তিনি।
যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হাসান কবির সাংবাদিকদের বলেন, 'মঙ্গলবার ভোরে ওই এলাকায় একদল যুবক ছিনতাই করছিল। স্থানীয়রা তাদের ধাওয়া করলে দুজন ধরা পড়ে এবং গণপিটুনির শিকার হয়। বাকিরা পালিয়ে যায়।'
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতেসংবাদমাধ্যম আরাফাত ও হারুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। তবে তাদের পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার ৬ দিন আগে ২১ অক্টোবর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ভেতর আলম শেখ নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। চাকরির খোঁজে ঢাকায় আসা আলম মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন এবং তাকে 'ছেলেধরা' সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই ৩টিসহ চলতি মাসে সারা দেশে অন্তত ১৫টি ‘পিটিয়ে হত্যার’ ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনা আবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন সাংবাদিকদের বলেন, 'যেটাকে আমরা গণপিটুনি বলছি, সেটি মূলত "মব-সহিংসতা" বা স্পষ্টত সন্ত্রাসবাদ। রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামারুম মুনিরা দাবি করেন, পিটুনির খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তিনি আরও দাবি করেন, আগের তুলনায় বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা কমেছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো।
এদিকে সরকার বারবারই বলে আসছে যে, মব সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
গত ১ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরোপুরি সতর্ক রয়েছে।
সিলেটে বিজিবির একটি স্থাপনা উদ্বোধনকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, 'আমরা অত্যন্ত সতর্ক ও সচেতন। বাংলাদেশে মব সহিংসতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, আমরা তা কঠোরভাবে দমন করব।'
তিনি আরও বলেন, মব সহিংসতা মোকাবিলার জন্য নতুন কোনো আইনের প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান আইনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
মব সহিংসতা নিয়ে সরকারের মূল্যায়নের সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যের বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ৬৩টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৪০ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত বছরের একই সময়ে ১০৭টি ঘটনায় ৬৩ জন নিহত হয়েছিলেন।
সে হিসেবে এ বছর 'মব সহিংসতার' ঘটনা ৪১ দশমিক ১২ শতাংশ কমেছে। এছাড়া আহতের সংখ্যা ৮২ থেকে কমে ৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে বলে সরকারি তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম নয় মাসে মব সহিংসতার ঘটনায় ১৭১ জন নিহত হয়েছেন, যা সরকারের দেওয়া সংখ্যার চেয়ে ৪ গুণের বেশি।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) দেওয়া তথ্য আরও উদ্বেগজনক। তাদের হিসাবে, একই সময়ে ৩৯৮টি মব সহিংসতার ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হয়েছেন।
আসকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ১২৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৯৮ জন মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন। সংস্থাটির রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৯৭ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই ১৬৮ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি আরও জানায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪১৩টি মব সহিংসতার ঘটনায় ২৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মব সহিংসতায় আহত হওয়ার পর হাসপাতাল থেকেও রোগীদের টেনে বের করে মারধরের মতো ঘটনা ঘটছে। যেমন—১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটায় ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ এনে ৩৮ বছর বয়সী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে আহত করা হয়।
সেদিন পুলিশ তাকে হামলাকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু পরে আরেকদল লোক তাকে হাসপাতাল থেকে জোর করে নিয়ে যায় এবং আবারও মারধর করে। অন্য একটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
২০২৪ সাল থেকে মব সহিংসতার কারণে কয়েকশ মানুষ নিহত হলেও এবং দ্রুত বিচারের বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও বেশ কিছু আলোচিত মামলার এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।
২০২৫ সালের ৯ আগস্ট রংপুরে চুরি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বুড়িরহাট হাই স্কুলে শত শত মানুষ তাদের মারধর করছে। এই ঘটনায় বাধা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ৮ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত রুবেল পাইকার জামিনে বের হয়ে জানুয়ারি মাসে তাদের হুমকি দিয়েছে। এ নিয়ে তারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও অভিযোগ দায়ের করেছেন।
তারাগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, এ ঘটনায় ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং খুব দ্রুতই আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চুরি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তোফাজ্জল হোসেনকে। পুলিশ প্রথমে ২১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছিল, পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট জমা দেয়।
চলতি বছরের ১০ মার্চ ঢাকা আদালত তা আমলে নিয়ে ২২ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন, যার মধ্যে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একইদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম আহমেদকে (শামীম মোল্লা)। তবে এই ঘটনায় পিবিআই এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বিনোদপুর বাজারে পিটিয়ে হত্যা করা হয় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে। এই ঘটনার তদন্ত প্রথমে স্থানীয় পুলিশ, পরে ডিবি এবং সবশেষে পিবিআইকে দেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি এবং তদন্তেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় 'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের' অভিযোগে পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মব সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন বিভিন্ন গোষ্ঠী জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটাতে মব সহিংসতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
তিনি মনে করেন, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সমাজে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেক অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে।
'রাষ্ট্র বারবার অপরাধীদের কাছে কঠোর কোনো বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে তারা মনে করছে যে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব,' বলেন তিনি।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসিরুদ্দিন এলান বলেন, মানুষ যখন উত্তেজিত জনসমষ্টির অংশ হয়, তখন তাদের বিচার-বিবেচনা লোপ পায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে মব তৈরি করা হয়।
তিনি মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলসহ সারা দেশে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, 'মানুষ যখন রাষ্ট্র থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।'
তিনি আরও বলেন, অতীতের সরকারগুলোর দুর্বল ভূমিকা এবং সামাজিক বিভাজনের কারণে মব সহিংসতাকে অনেকে ‘ন্যায্য’ বলে মনে করতে শুরু করেছে। এই মানসিকতা অপরাধীদের মনে এমন বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে যে, তারা আইনের হাত থেকে সহজেই রেহাই পাবে।



