ঐতিহাসিকভাবেই শহরগুলো গড়ে ওঠে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে। শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ মানুষকে শহরমুখী করে, নতুন বসতি গড়ে ওঠে এবং বদলে যায় নগরের চেহারা।
ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে অনেক শহরের বিকাশ ঘটেছে। পরে এশিয়ার অনেক দেশেও শিল্পনির্ভর অর্থনীতির হাত ধরে নগরায়ণ দ্রুততর হয়েছে। শিল্পায়ন ও শহর সম্প্রসারণের এই পারস্পরিক সম্পর্ক বাংলাদেশও দেখেছে। যদিও একেকটি শহরের পথচলার গল্প বেশ আলাদা। এর মধ্যে খুলনা একটি দারুণ দৃষ্টান্ত—যেখানে শহরের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার পরও নগরজীবনের চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে বেড়ে চলে, তা স্পষ্ট দেখা যায়।
বিশ্ব নগর দিবস উদযাপনের এই সময়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যে শহরে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান কমছে, অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ এসে বসতি গড়ছে, সেই শহরের পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?
আবাসন, অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার ওপর বাড়তি চাপ সামলে কীভাবে শহরকে বাসযোগ্য রাখা যায়?
এক সময় খুলনা ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী। এর ভৌগোলিক অবস্থান, নদীপথের যোগাযোগ, মোংলা বন্দরের সান্নিধ্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্পদের সহজলভ্যতা এ শহরে পাট, টেক্সটাইল, কাগজ, নিউজপ্রিন্ট ও দেশলাইয়ের মতো বিভিন্ন শিল্পের বিকাশে সহায়তা করেছে। খালিশপুর, দৌলতপুর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছিল। আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা খুলনায় আসতেন। এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করেই শহরটি বড় হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠে আবাসিক এলাকা, বাজার, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা।
তাই শিল্পায়ন যেমন ছিল একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, তেমনি তা ছিল খুলনার নগর রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তিও। খুলনার শিল্পহীন হয়ে পড়া এবং শহর হিসেবে পিছিয়ে পড়ার ওপর আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ কতটা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত ছিল।
১৯৫০ ও ৬০ এর দশকে খালিশপুরে বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার ফলে তুলনামূলক কম জনবসতিপূর্ণ একটি এলাকা প্রাণবন্ত শিল্প শহরে পরিণত হয়েছিল। এক সময় এই মিলগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন এবং আনুমানিক এক লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এসব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
এই শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, শ্রমিকদের আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থা। খালিশপুর হাউজিং এস্টেটই প্রমাণ করে যে, এক সময় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন কতটা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করে, যা খুলনার অর্থনীতিকে পুরোপুরি বদলে দেয়। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদন খাতে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের আয়ের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর খুলনার শিল্পনির্ভর অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমাদের গবেষণা বলছে, এই শিল্পের পতনকে কেবল উৎপাদন খাত থেকে উন্নত সেবাভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ছিল শিল্পনীতির পরিবর্তন, আধুনিকায়নের অভাব, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং শিল্প ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার এক মিশ্র ফল।
অনেক শহরে শিল্প সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থান কমার পর সেবা খাতে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু খুলনায় শিল্পের পতনের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যথেষ্ট বিকশিত হয়নি।
শিল্পকারখানা বন্ধ হলেও মানুষের বেঁচে থাকার বা জীবিকার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং অনেক পরিবারকে বেঁচে থাকার জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে হয়েছে। কেউ ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করছেন, কেউ ছোট ব্যবসা করছেন, কেউ পরিবহন খাতে কাজ করছেন। আবার অনেকে ঘরে বসে ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনা করছেন কিংবা দৈনিক মজুরির কাজ করছেন।
শিল্পভিত্তিক চাকরি থেকে অনানুষ্ঠানিক জীবিকায় এই রূপান্তর খুলনার নগর উন্নয়ন ও এর পরিবর্তনশীল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলেও এটি নিয়ে আলোচনা খুব কম হয়েছে।
খুলনার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি নিয়ে আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কাজ কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা ব্যবসা করার ইচ্ছা থেকে তৈরি হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির অভাব, সহজে কাজ শুরু করার সুযোগ, অভিবাসন, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশের বাধা মানুষকে এসব পেশায় যেতে বাধ্য করেছে।
অনেক পরিবারের জন্য অনানুষ্ঠানিক কাজ এখন টিকে থাকার একমাত্র উপায়। একইসঙ্গে এসব কাজ শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এটি গতানুগতিক নগর পরিকল্পনার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। বেশিরভাগ মাস্টারপ্ল্যানে জমি ব্যবহার (জোন তৈরি), রাস্তাঘাট, আবাসন এবং ভৌত অবকাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু মানুষ কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে—বিশেষ করে যারা অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল, সে বিষয়ে খুব একটা নজর দেওয়া হয় না।
কেবল আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকার জন্য জমি বরাদ্দ করলেই একটি শহর টেকসই হয়ে ওঠে না। মানুষকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও নগর পরিকল্পনার দায়িত্ব।
২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালে আইলার পর খুলনার সংকট আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে মারাত্মক আঘাত হানে। এর ফলে বসতি, কৃষিজমি, অবকাঠামো ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার অনিশ্চয়তা বহু মানুষকে বিকল্প কাজের সন্ধানে এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার আশায় খুলনার মতো শহরে চলে আসতে বাধ্য করে।
অনেক মানুষের কাছে খুলনা ছিল নতুন করে জীবন শুরু করার একটি জায়গা। কিন্তু তারা এমন এক শহরে এসে পৌঁছান যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ আগেই সীমিত হয়ে পড়েছিল। ফলে এদের অনেকেই অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং বস্তি, কম ভাড়ার বাসা কিংবা পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
এই শহরের দারিদ্র্যকে কেবল অভিবাসনের ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত শিল্প খাতের পতন, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের অভাব, সাশ্রয়ী আবাসনের ঘাটতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের এক জটিল পরিণাম।
এর প্রভাব শহরের বিস্তারেও স্পষ্ট। খুলনার শহরতলী ছড়িয়ে পড়ছে, কৃষিজমি ও নিচু জমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে, অপরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকা বাড়ছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে এবং নাগরিক সেবা প্রাপ্তিতে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে পুরোনো শিল্পাঞ্চল ও প্রতিষ্ঠিত কিছু এলাকায় দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা ও অবকাঠামোগত সংকট।
এতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে—শহরটি আয়তনে বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে, অথচ এর চিরায়ত অর্থনৈতিক ভিত্তি সংকুচিত হচ্ছে। কিছু পুরোনো এলাকায় মানুষের বসবাস বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাচ্ছে।
সমস্যা শুধু অপরিকল্পিত নগরায়ণ নয়। বরং শহরের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, পরিবেশ ও ভৌগোলিক সম্প্রসারণের পরিবর্তিত সম্পর্কের সঙ্গে নগর পরিকল্পনা তাল মেলাতে পারেনি।
খুলনার নগর টেকসই উন্নয়ন ও কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের আগের গবেষণায় দেখা গেছে, কৌশলগত পরিকল্পনার বড় বড় বুলির সঙ্গে এর বাস্তব বাস্তবায়নের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। শহরের পরিকল্পনা কাঠামোতে ‘টেকসই উন্নয়নের’ কথা বড় গলায় বলা হলেও সামাজিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, জনসম্পৃক্ততা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং অবকাঠামো ও জরুরি সেবায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
এই দুর্বলতাগুলো আজও সমানভাবে প্রযোজ্য। সম্ভবত এর চেয়েও বড় ও মৌলিক সমস্যা হলো আগের পরিকল্পনাগুলো আসলে কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট ধারণার অভাব।
দীর্ঘ সময় ধরে খুলনায় একের পর এক মাস্টারপ্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যান, ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বা উন্নয়ন প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ কি নিশ্চিত করে বলতে পারবে যে এই পরিকল্পনাগুলোর কতটুকু বাস্তবে রূপ পেয়েছে? কতটি সুপারিশ কার্যকর হয়েছে, কতটি অবহেলিত রয়ে গেছে এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের এই পার্থক্যের কারণ কী—তা কেউ কি খতিয়ে দেখেছে?
এগুলো পরিকল্পনা সংক্রান্ত জবাবদিহিতার খুবই মৌলিক প্রশ্ন, অথচ এগুলো নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামানো হয় না। কারণ বাস্তবায়নের মূল্যায়ন না হলে আগের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। একই সুপারিশ বারবার নতুন পরিকল্পনায় যুক্ত হতে পারে, অথচ সেগুলো বাস্তবায়নের বাধা অমীমাংসিত থেকে যায়।
খুলনার ঠিক কেমন পরিকল্পনা দরকার?
খুলনার এখন গতানুগতিক জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে একটি সমন্বিত, কৌশলগত ও জনমানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দরকার—যা একইসঙ্গে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করবে।
তবে এর মানে এই নয় যে, শিল্পায়ন ও নগর উন্নয়নের চিরন্তন সম্পর্কটি ফেলে দিতে হবে। বরং খুলনার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে কার্যকর নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্পনির্ভর উন্নয়ন কতটা জরুরি।
প্রথমত, নগর পরিকল্পনাকে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। খুলনার শিল্প অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং নতুন উদীয়মান খাতগুলোতে বৈচিত্র্য আনতে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োজন।
মোংলা বন্দর, আঞ্চলিক যোগাযোগ রুট, বিশ্ববিদ্যালয় এবং চারপাশের কৃষি ও উপকূলীয় অর্থনীতির সঙ্গে এর সংযোগ কাজে লাগিয়ে লজিস্টিকস, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা শিল্প এবং জ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব।
তবে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত হবে না। কোথায় কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, সাবেক শিল্পশ্রমিকদের কীভাবে সহায়তা করা হবে এবং নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কীভাবে পুরোনো আবাসিক এলাকার সঙ্গে যুক্ত করা হবে—এসব বিষয়ও পরিকল্পনায় থাকতে হবে।
শিল্প একা একা চলে না। এর জন্য কৃষি উৎপাদন, কাঁচামাল, পরিবহন, লজিস্টিকস, সহায়ক ব্যবসা ও সেবা খাতের প্রয়োজন হয়। একইভাবে, উৎপাদিত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিপণন ও বাণিজ্যের নতুন দরজা খুলে দেয়।
তাই খুলনার ভবিষ্যৎ শিল্পায়ন কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো শিল্প এলাকা বা অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে না ভেবে বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে মিলিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। এই সংযোগগুলো শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করবে এবং খুলনা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
অব্যবহৃত শিল্পজমিগুলোকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে হবে। পরিবেশগত ঝুঁকি, জমির মালিকানা এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে এসব জায়গায় নতুন শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগের কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মিশ্র ব্যবহারের অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক সুবিধা গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশের বড় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সম্ভাবনা। কিন্তু এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
খালিশপুরের শিল্পের পতন নিয়ে আমাদের গবেষণায় একটি বৈপরীত্য দেখা গেছে। এক সময় শিল্পকারখানা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিকদের আকৃষ্ট করত এবং হাজারো পরিবারের জীবিকার ব্যবস্থা করেছিল। পরে এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় অনেক শ্রমিক কম আয়ের অনানুষ্ঠানিক কাজে যেতে বাধ্য হন। অন্যদিকে তরুণ ও সক্ষম শ্রমিকদের অনেকে কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যান।
অর্থাৎ, মানবসম্পদকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার বদলে খুলনা তার নিজ কর্মীদের ধরে রাখতে ও সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি।
এখানে নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী না করে খুলনা কীভাবে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা নিতে পারবে?
কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি হলেই জনমিতিক সুবিধা নিশ্চিত হয় না। এর জন্য শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, শিল্পের বহুমুখীকরণ, উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ প্রয়োজন।
খুলনার বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও শিল্পের পুনরুজ্জীবনের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে তোলা সম্ভব। নগর পরিকল্পনাকে তাই শুধু শিল্পকারখানা বা আবাসনের জন্য জমি বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরির উপযোগী পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।
এ উদ্যোগ না নিলে তরুণদের একটি অংশ অনিশ্চিত অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে অথবা ভালো কাজের সন্ধানে শহর ছাড়তে বাধ্য হবে।
দ্বিতীয়ত, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে শহরের গলার কাঁটা না ভেবে একে নগর জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকার করতে হবে। হকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং ঘরে বসে কাজ করা শ্রমিকরা শহরের মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা ও কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। উচ্ছেদ অভিযান, কঠোর বিধিনিষেধ বা অনানুষ্ঠানিক কাজগুলোকে হটিয়ে দেওয়া মানে সমস্যা সমাধান নয়। এতে কেবল মানুষের দুর্দশা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। এর বদলে নগর পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট ও উপযুক্ত স্থান বরাদ্দ করা উচিত—যেমন হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজার, সাশ্রয়ী কর্মক্ষেত্র, প্রয়োজনীয় সেবা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অর্জনের বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করা।
তৃতীয়ত, আবাসন ও বসতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খুলনাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে।
‘গ্রিনল্যান্ড’ নামে অনানুষ্ঠানিক বসতি নিয়ে আমাদের গবেষণাটি দেখায় যে, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে স্থানীয় মানুষের সংঘবদ্ধ উদ্যোগ ও সামাজিক নেটওয়ার্ক কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে জনগণের অংশগ্রহণ কেবল নামমাত্র আলোচনা বা নির্দিষ্ট প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এলাকার অগ্রাধিকার নির্ধারণ, অবকাঠামো পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্থানীয় উন্নয়নের তদারকি এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষিতে কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
মানুষকে উচ্ছেদ করা বা গতানুগতিক হাউজিং এস্টেট বানানোর ওপর ভর না করে, শহরে বিদ্যমান বস্তি বা বসতির অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, সাশ্রয়ী ভাড়ায় বাসা, ধাপে ধাপে আবাসন তৈরির সুযোগ এবং জনসমর্থিত আবাসন উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা উচিত।
নিম্নআয়ের শ্রমিক ও জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য এই ধরনের পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত জরুরি, যারা মূলধারার আবাসন বাজারে বাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখেন না।
চতুর্থত, খুলনার অপরিকল্পিতভাবে বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। শহরের চারপাশের কৃষিজমি কেটে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন বানানোর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়ছে।
কৃষিজমি কোনো ফেলে রাখা খালি জায়গা নয় যে যখন ইচ্ছা শহর বানিয়ে ফেলা যাবে। এটি খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং গ্রামীণ উৎপাদনের সঙ্গে শহরের বাজার ও শিল্পের সংযোগ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
তাই উর্বর কৃষিজমি রক্ষা করাকে মেট্রোপলিটন পরিকল্পনার মূল নীতি বানাতে হবে। খণ্ডিতভাবে শহরকে বাইরে ছড়িয়ে না দিয়ে, যেসব জায়গায় ইতোমধ্যে অবকাঠামো ও সেবা চালু আছে বা সহজে উন্নত করা সম্ভব, সেখানে পরিকল্পিত উপায়ে শহরের ঘনত্ব বাড়ানো উচিত।
উপযুক্ত ও মিশ্র ব্যবহারের উন্নয়ন, অব্যবহৃত জমির সঠিক ব্যবহার এবং বর্তমান অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার কৃষিজমি ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকার ওপর চাপ না কমিয়েও শহরের ভবিষ্যৎ চাহিদাকে সামলাতে পারবে।
তবে ঘনত্ব বাড়ানোর মানে এই নয় যে মানুষে গাদাগাদি করে থাকবে। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খোলা জায়গা, যাতায়াত ব্যবস্থা, সাশ্রয়ী আবাসন এবং জরুরি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ্য হতে হবে কেবল বহুতল ভবন বাড়ানো বা ইটের জঙ্গল তৈরি করা নয়, বরং একটি কার্যকর, সহজলভ্য ও বাসযোগ্য শহরের পরিবেশ গড়ে তোলা।
পঞ্চমত, জলবায়ু সহনশীলতা হতে হবে নগর উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। খুলনার নিচু ভূপ্রকৃতি এবং জলমগ্নতা, বন্যা, লবণাক্ততা ও চরম আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা বিবেচনা করে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে যা শহরের প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যকে সম্মান জানায়।
আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করা অব্যাহত রাখলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। তাই যেকোনো জমি ব্যবহারের সিদ্ধান্তের আগে বন্যার ঝুঁকি, পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা এবং পরিবেশগত সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জলবায়ু অভিযোজন কেবল বাঁধ নির্মাণ, ড্রেন কাটা বা প্রকৌশলগত অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটি পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা দূর করার বিষয়টিও মাথায় রাখবে, বিশেষ করে যাদের জীবিকা আগে থেকেই অনিশ্চিত।
ষষ্ঠত, খুলনায় মহানগর পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। খুলনার অর্থনীতি ও পরিবেশ কেবল খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পায়ন, আবাসন বাজার, মানুষের যাতায়াত, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং জলবায়ু অভিবাসন—সবকিছুই শহরটিকে এর আশপাশের শহুরে ও গ্রামীণ এলাকার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
অথচ পরিকল্পনা, অবকাঠামো, সেবা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বগুলো ছড়ানো রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), খুলনা সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন সংস্থা, আশপাশের স্থানীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত কাঠামো থাকা দরকার, যেখানে স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ব্যবস্থা থাকবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, পরিকল্পনাকে কেবল নির্দিষ্ট সময় পর পর মাস্টারপ্ল্যান বানানোর একটি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে, এটিকে ধারাবাহিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
এই ক্ষেত্রে ‘এন্টারপ্রেনারিয়াল প্ল্যানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ বা উদ্যোক্তাভিত্তিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা একটি চমৎকার কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে।
লন্ডনের ডকল্যান্ডস এলাকার পুনর্গঠনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কীভাবে সরকারি নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি মৃতপ্রায় শিল্প এলাকাকে নতুন অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব।
খুলনার ক্ষেত্রে ডকল্যান্ডসের উন্নয়ন মডেল হুবহু অনুসরণ করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে হবে। তাদের কাজ শুধু জমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
এ ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে খুলনার পুরোনো শিল্পাঞ্চল পুনরুজ্জীবিত করা, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে জমি নিয়ে জল্পনা, মানুষের উচ্ছেদ, পরিবেশের ক্ষতি কিংবা নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হতে দেওয়া যাবে না। উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নগরের সুফল সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, শুধু জমির দাম বাড়ানো বা বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ নয়।
কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে খুলনার সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পদ কাজে লাগানো এবং নির্দিষ্ট উদ্যোগের ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন করা সম্ভব। এতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি পরিবর্তিত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
এ প্রক্রিয়ায় মানুষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক বসতির বাসিন্দা, শিল্পশ্রমিক, নারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানান্তরিত মানুষ, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়, নাগরিক সমাজ—সবারই শহরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অর্থবহ ভূমিকা থাকা উচিত।
পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাস্তবায়নের সময়সীমা, অর্থায়নের ব্যবস্থা এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মহাপরিকল্পনা ও উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করলে জবাবদিহি বাড়বে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনুমাননির্ভর না হয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা সম্ভব হবে।
খুলনার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো শহর চিরকাল তার পুরোনো অর্থনৈতিক সুবিধার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। শিল্পের পতন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, পরিবেশগত চাপ ও মানুষের স্থানান্তর একটি শহরের অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং উন্নয়নের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
বিশ্ব নগর দিবসে খুলনার অভিজ্ঞতা আমাদের নগর পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়। লক্ষ্য শুধু গোছানো শহর তৈরি করা নয়, বরং এমন একটি নগর গড়ে তোলা, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শক্তিশালী হবে, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা করা যাবে।
খুলনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে হারিয়ে যাওয়া শিল্পের স্মৃতি কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকটের ওপর নয়, বরং শিল্পের পুনরুজ্জীবন, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, তরুণদের সম্ভাবনা, কৃষিজমি সংরক্ষণ, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনসম্পৃক্ততা ও জলবায়ু অভিযোজনকে একসূত্রে গাঁথতে পারার ওপর।
ড. মো. আশিক উর রহমান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক। তার গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র নগর দারিদ্র্য, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, আবাসন এবং টেকসই নগর উন্নয়ন।



