বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
২০শে কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

সারাদেশ

‘নিজেদের তৈরি মরণফাঁদে’ ঝরছে প্রাণ

‘নিজেদের তৈরি মরণফাঁদে’ ঝরছে প্রাণ...

র
রাহুল হাসান· প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৪ পিএমসর্বশেষ: ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৪ পিএম
‘নিজেদের তৈরি মরণফাঁদে’ ঝরছে প্রাণ

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গাজীরদরগাহ ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন এলাকা থেকে জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে যেতে রেললাইনের উপর স্থানীয়রা যাতায়াতের জন্য লেভেল ক্রসিং তৈরি করেছেন। রেলওয়ে বিভাগের অনুমোদন না থাকায় সেখানে গেটম্যান কিংবা ব্যারিয়ার নেই। ফলে নিজ দায়িত্বেই পার হতে হয়।

বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা বেতনা এক্সপ্রেসের ধাক্কায় একটি কভার্ডভ্যান দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গুরুতর আহত হন কভার্ডভ্যানচালক আতিয়ার রহমান (৫৫)। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। নিহত আতিয়ার রহমান ঝিকরগাছার কাটাখাল কলোনিপাড়ার বাসিন্দা।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর যশোর সদরের কৃষ্ণবাটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় একটি ইজিবাইককে চাপা দেয় ট্রেন। ঘটনাস্থলেই মারা যান ইজিবাইকচালক আজিজুর রহমান ও যাত্রী এরশাদ আলী। শুধু এই দুটি ঘটনা নয়, এক দশকে এ অঞ্চলে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে অন্তত অর্ধশত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮০ জন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পাকশী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্যমতে, যশোর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যশোর-বেনাপোল, যশোর-কোটচাঁদপুর ও যশোর-খুলনা রুটের যশোর অংশে মোট ১৮৩টি রেলক্রসিং রয়েছে; এগুলোর মধ্যে ১০১টি অবৈধ। আর বৈধ যে ৮২টি রয়েছে, সেগুলোর ৩৮টির নেই কোনো গেটম্যান।

রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, যেখানে-সেখানে রাস্তা নির্মাণের ফলে বাড়ছে অনুমোদনহীন রেলক্রসিং। এজন্য স্থানীয়দের পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এলজিইডি ও পৌরসভাও দায়ী।

সরেজমিন দেখা গেছে, রেল বিভাগের হিসাবের বাইরেও অসংখ্য অবৈধ রেলক্রসিং রয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের পছন্দমতো তৈরি করে নিয়েছেন। ঝুঁকি নিয়েই প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছেন নাগরিকরা। কোথাও কোথাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতা সাইনবোর্ড বসালেও বেশির ভাগ বোর্ডের লেখা অস্পষ্ট আর নাজুক। অরক্ষিত ক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে এবং ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

যশোর-বেনাপোল রেললাইনে ২৮টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে চারটি বাদে বাকি ২৪টি রেলক্রসিংয়ে গেটবার নেই। যশোর-কোটচাঁদপুর রুটে খড়কিতে আধা কিলোমিটারের ভেতরে সাতটি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো যশোর পৌরসভার দক্ষিণ অংশের অনেক মানুষের শহরে প্রবেশদ্বার খড়কি ধোপাপাড়ার সড়কটি। এই সড়কের মাঝ দিয়ে চলে গেছে যশোর-কোটচাঁদপুর রেলপথ। অথচ এই ক্রসিংয়ে নেই কোনো গেটম্যান। সতর্কতা সাইনবোর্ড থাকলেও বোর্ডের লেখা অস্পষ্ট আর নাজুক। ঝুঁকি নিয়েই মানুষ পারাপার হচ্ছেন।

খড়কি এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন পলাশ বলেন, এই এলাকাটি খুবই জনবহুল। এলাকার মানুষের প্রয়োজনেই লেভেল ক্রসিং তৈরি হয়েছে কিন্তু কোনো গেটম্যান কিংবা ব্যারিয়ার নেই। মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নেই। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে রেল বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

স্থানীয় বাসিন্দা সাহেব আলী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংয়ের ওপারে প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। প্রতিদিন বাচ্চারা রেলক্রসিং পার হয়ে স্কুলে যায়। ট্রেনের শব্দ শুনে আমরা সতর্ক হই, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে গেটম্যান খুবই জরুরি।

এদিকে যশোর-বেনাপোল রেললাইনের খড়কি এলাকায় অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই মহাসড়ক। এখানে অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত দুজন গেটম্যান বলেন, মহাসড়কের এই লেভেল ক্রসিং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা ঠিক সময়ে ব্যারিয়ার নামিয়ে দিই। পথচারীরা নিয়ম মানতে চায় না। তারা আমাদের গালিগালাজ করে। আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকি।

এ বিষয়ে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রুহুল আমিন বলেন, অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ের পাশাপাশি স্থানীয়দের প্রয়োজনের তাগিদেই ভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে অসংখ্য রেলক্রসিং তৈরি হয়েছে। সেই লেভেল ক্রসিংগুলোর বৈধতা দেয়নি রেলওয়ে। ফলে অবৈধ রেলক্রসিং বাড়ছে। মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাবে স্থানীয়দের তৈরি অবৈধ রেলক্রসিং মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। রেল যোগাযোগ নিরাপদ করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে যশোর অঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী চাঁদ আহমেদ বলেন, অবৈধ রেলক্রসিংগুলো তৈরি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা সরকারি সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। আমরা অবৈধ গেটের দুই পাশে সাবধান বোর্ড স্থাপন করে দিয়েছি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিই। আমাদের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তারা গেটের বৈধতা চাইলে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতিনিয়ত আমরা রেললাইন পরিদর্শন করি, যাতে কেউ অবৈধ রেলক্রসিং তৈরি করতে না পারে। কেউ অবৈধ রেলক্রসিং তৈরির চেষ্টা করলে আমরা প্রতিরোধ করছি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি করছি।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
র

রাহুল হাসান

প্রতিবেদক

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ডেইলি বরিশাল। সাংবাদিকতায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ