শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
২১শে কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

সংসদের বাইরে বিকল্প উদ্যোগ, ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ গড়ছে জামায়াত জোট

সংসদের বাইরে বিকল্প উদ্যোগ, ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ গড়ছে জামায়াত জোট...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৩৬ পিএমসর্বশেষ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৩৬ পিএম
সংসদের বাইরে বিকল্প উদ্যোগ, ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ গড়ছে জামায়াত জোট

সংসদে সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারের উদ্যোগে অংশ না নিয়ে এবার সংসদের বাইরেই জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিকল্প প্রক্রিয়া তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এ লক্ষ্যে ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটটি।

পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং এ বিষয়ে জনমত গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জোটের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও সম্পৃক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে অংশ না নেওয়া এবং সরকারের প্রস্তাবিত প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তির মধ্যে এ উদ্যোগকে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে নিজেদের বিকল্প অবস্থান ও কর্মপরিকল্পনা সামনে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেন, সরকার গণভোটের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে এবং সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে। এ কারণে গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা এ উদ্যোগ নিচ্ছেন।

‘এ বিষয়ে ১১ দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা একটি পরিষদ গঠন করব। তবে এর সদস্যসংখ্যা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে,’ বলেন তিনি।

পরিষদের কাজ হবে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে জনমত গঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং রায় বাস্তবায়নে করণীয় নির্ধারণ করা। সরকারের গঠিত বিশেষ কমিটির বিপরীতে এটি ১১ দলের পক্ষ থেকে সংস্কারের প্রক্রিয়া ও রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ কি না, জানতে চাইলে আযাদ বলেন, ‘তা তো অবশ্যই।

পরিষদের গঠন ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সব দলের অংশগ্রহণ থাকবে। সময়মতো সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।

১১ দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, গত ২৭ অক্টোবর জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন এ বিষয়ে লিয়াজোঁ কমিটিও বৈঠক করে।

তিনি বলেন, মূলত জোটের কয়েকজন সংসদ সদস্য এবং প্রতিটি শরিক দল থেকে সংসদ সদস্য নন, এমন একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে পরিষদ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

জালালুদ্দীনের ভাষ্য, ১১ দলের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। ফলে সংস্কারের বিষয়ে তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে।

‘আমরা তো চাচ্ছি সংবিধান সংস্কার, আর সরকার চাচ্ছে সংশোধন। আমরা ১১ দল মাঠে-ময়দানে কর্মসূচি পালন করছি। আমাদের সংসদ সদস্যরা যেহেতু সংবিধান সংস্কারের শপথ নিয়েছেন, তাদেরও একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে,’ বলেন তিনি।

পরিষদ সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে। আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন জালালুদ্দীন।

এদিকে, সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ গঠনের জন্য ১৫ সদস্যের একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাবনা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন। ১১ দলের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার পর তা চূড়ান্ত হবে বলে জানান তিনি।

নাজিবুর রহমানের মতে, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ থেকে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতির পথে হাঁটছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও উচ্চকক্ষের স্পিকার-সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের প্রস্তাবগুলো সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তাদের মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, গণভোটে উচ্চকক্ষের ৫০ শতাংশ আসন পিআর পদ্ধতিতে এবং বাকি ৫০ শতাংশ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া, সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সনদ ও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত কমিটি গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান না করায় সংসদ সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাচ্ছেন না উল্লেখ করে নাজিবুর রহমান বলেন, সভা আহ্বান, প্রতীকী সভাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি ফোরাম গঠনের চিন্তাভাবনা চলছে।

‘শুধু একটি রূপরেখা নয়, জুলাই সনদ ও গণভোটের আলোকে সংবিধান কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সংস্কারের একটি খসড়া আমরা তুলে ধরব। পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিও নেওয়া হবে,’ বলেন তিনি।

পরিষদে হামিদুর রহমান আযাদ, নাজিবুর রহমান মোমেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আইনজীবী শিশির মনির এবং শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা ও জামায়াত মনোনীত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম থাকতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংসদের বিশেষ কমিটির সঙ্গে বিরোধী জোটের দূরত্বের মধ্যেই নতুন এই উদ্যোগ আসছে।

গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ খালি রাখা হলেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো সদস্যের নাম প্রস্তাব করেনি।

বিরোধী দলের নেতাদের বক্তব্য, কমিটির ধারণাগত ভিত্তিই তারা গ্রহণ করেন না। ফলে এতে প্রতিনিধি দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। তবে বিএনপি জানিয়েছে, জামায়াতের পক্ষ থেকে নাম প্রস্তাব করা হলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

গত ৪ আগস্ট বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক হয়। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কমিটি। ওই বৈঠকেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো শরিক দল অংশ নেয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচনব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনসহ ১১টি খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সংশ্লিষ্ট কমিশনগুলোর সুপারিশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়।

পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন। ওই আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।

আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জাতীয় সংসদের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান ছিল। তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুধু জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সংসদ সদস্য দুটি শপথই নেন।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ