ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে রূপকথার গল্পের মতো এক ইনিংস খেলেছেন তাওহিদ হৃদয়। ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্টে ইতিহাস গড়েছেন ২৫ বছর বয়সী এই তারকা ব্যাটসম্যান।
দলের ব্যাটিং বিপর্যয়ে একাই হাল ধরে রাখেন হৃদয়। তিনি ৩৫৯ বল মোকাবেলা করে ২২টি বাউন্ডারি আর ১১টি ছক্কার সাহায্যে ২৪২ রানের বীরোচিত ইনিংস খেলেন। লড়াকু সেই ইনিংস খেলার পথে রেকর্ডের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন তাওহিদ।
অন্য প্রান্তে একের পর এক ব্যাটসম্যান বিদায় নেওয়ার কারণে ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ট্রিপল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়ে ২৪২ রানে অপরাজিত থাকতে হলো তাকে। গৌরবময় এই ইনিংসে বেশ কিছু কীর্তি গড়েছেন তাওহিদ।
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংসটি এখন তাওহিদ হৃদয়। তিনি ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। তার আগে বাংলাদেশ দলের হয়ে মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান। মুশফিক একাই ৩টি ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে ২১৯ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন মুশফিকুর রহিম। প্রায় ৮ বছর পর তাকে টপকে গেলেন হৃদয়।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডটি আগে থেকেই হৃদয়ের। গত আগাস্ট-সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে খেলেছিলেন ৩৫০ রানের অপরাজিত ইনিংস।
ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট ও পঞ্চম ইনিংসে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির দেখা পেলেন হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে দ্বিশতকের স্বাদ পাওয়া মাত্র চতুর্থ ক্রিকেটার ২৬ ছুঁইছুঁই এই ব্যাটার।
ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার তাওহিদ হৃদয়। এত দিন প্রথম সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ ছিল মুমিনুল হকের। ২০১৩ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি খেলেন ১৮১ রানের ইনিংস।
সব মিলিয়ে টেস্ট ইতিহাসে প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া ৪৫তম ব্যাটসম্যান হৃদয়। এর মধ্যে প্রথম সেঞ্চুরিতে তার চেয়ে বেশি রান করতে পেরেছেন শুধু ১১ জন।
বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করলেন তাওহিদ হৃদয়। ২০১৮ সালে মিরপুর টেস্টে মাহমুদউল্লাহর করা ১৩৬ রান ছিল এতদিন ক্যারিবিয়দের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ।
হৃদয়ের ইনিংসজুড়ে ছিল রক্ষণ আর আক্রমণে দারুণ মিশেল। নিজের শক্তির জায়গায় বল পেলেই ছক্কায় উড়িয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে তার ব্যাট থেকে এসেছে ১১টি ছক্কা। বাংলাদেশের হয়ে এক ইনিংসে এটিই সবচেয়ে বেশি ছয়ের রেকর্ড।
২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনায় ২০৬ রানের ইনিংস খেলার পথে তামিম ইকবাল মেরেছিলেন সাতটি ছক্কা। ওই ইনিংসে ১৮০ পেরোনোর পর তিনটি ছক্কা মেরে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন সাবেক অধিনায়ক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল।
দেশের রেকর্ড ছাড়িয়ে ছক্কার বিশ্বরেকর্ডও নাগালে পেয়ে গিয়েছিলেন হৃদয়। কিন্তু হলো না। অন্য প্রান্তে আউট হয়ে গেলেন তাসকিন আহমেদ, দলের ইনিংস শেষ হয়ে গেল সেখানেই। হৃদয়ের ছক্কা তখন ১১টি।
আর একটি ছক্কা মারতে পারলেই স্পর্শ করতে পারতেন ওয়াসিম আকরাম ও জয়সওয়ালের বিশ্বরেকর্ড।
ইনিংসে ১১টি করে ছক্কা আছে হৃদয়সহ সাতজনের।
২৯ রানে দিনের খেলা শুরু করে ২১৩ রান যোগ করেছেন তাওহিদ হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে এক দিনের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এটি। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৭ রানের ইনিংস খেলার পথে এক দিনে ২১২ রান করেছিলেন সাকিব আল হাসান।
বাংলাদেশের ৩৮৬ রানের মধ্যে একাই ৬২.৬৯ শতাংশ রান করেছেন হৃদয়। টেস্ট ইতিহাসে ডাবল সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দলের ইনিংসে সর্বোচ্চ অবদানের রেকর্ড এটি।
১৯৬৯ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৫৮ রানের ইনিংস খেলার পথে দলের মোট সংগ্রহের (৪১৭) ৬১.৮৪ শতাংশ রান করেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সিমুর নার্স।
এছাড়া সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইনিংসে দলের স্কোরে হৃদয়ের চেয়ে বেশি অবদান রাখার নজির আছে স্রেফ সাতটি।
৩৫৯ বলের ম্যারাথন ইনিংসটি ২২ চারের পাশাপাশি ১১ ছক্কায় সাজিয়েছেন হৃদয়। সব মিলিয়ে বাউন্ডারি থেকে এসেছে ১৫৪ রান।
বাংলাদেশের হয়ে এক ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এটি।
নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৭ রানের ইনিংসে ৩১ চারে ১২৪ রান বাউন্ডারি মেরে করেছিলেন সাকিব আল হাসান।
২০১৮ সালে টেস্ট অভিষেকের পর সিলেটের মাঠটিতে ছিল না কোনো ডাবল সেঞ্চুরি। সেই অপেক্ষাও শেষ করলেন হৃদয়।
এই মাঠে আগের ছয় টেস্টে সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল মাহমুদুল হাসান জয়ের। গত বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি খেলেন ১৭১ রানের ইনিংস।
১৮৪ সপ্তম উইকেট হারানোর পর তাইজুল ইসলামকে নিয়ে ১১৭ রানের জুটি গড়েন হৃদয়। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অষ্টম উইকেটে এটিই প্রথম শতরানের জুটি।
এই মাঠে অষ্টম উইকেটে এতদিন সর্বোচ্চ জুটি ছিল কামিন্দু মেন্ডিস ও প্রাভাত জায়াসুরিয়ার। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৬৭ রানের জুটি গড়েছিলেন তারা ।
অষ্টম উইকেটে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি গড়েছেন হৃদয় ও তাইজুল। এখনও শীর্ষে রয়ে গেছে ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজের ১৪৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি।
এর বাইরে অষ্টম উইকেটে বাংলাদেশের শতরানের জুটি আছে আর একটি। ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১১৩ রান যোগ করেন মুশফিক ও নাঈম ইসলাম।
তাইজুল ইসলামের বিদায়ের পর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে আরও ৮৫ রান যোগ করেন হৃদয়। সিলেটে নবম উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড। গত মে মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে নবম উইকেটে ৬৪ রানের জুটি গড়েছিলেন লিটন কুমার দাস ও শরিফুল ইসলাম।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট পতনের পর নিজেদের স্কোরে আরও ২০২ রান যোগ করেছে বাংলাদেশ। শেষ তিন উইকেটে এটিই তাদের সর্বোচ্চ। ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ তিন উইকেটে ১৯৮ রান করেছিল টাইগাররা।






