মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬
২০শে আশ্বিন, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে মশার উৎস বিনাশ

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে মশার উৎস বিনাশ...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ৫:০৭ এএমসর্বশেষ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ৫:০৭ এএম
ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে মশার উৎস বিনাশ

কানের কাছে মশার বোঁ শব্দ শোনেনি এমন লোক কমই আছে। অনেকের ধারণা, মশারা মুখ দিয়ে করে এই শব্দ। ধারাণাটি ঠিক নয়। শব্দটা ওদের মুখের নয়, ডানা নাড়ানোর। শুনলে অবাক হবেন, একটি মেয়ে মশা মিনিটে ৬৬ হাজার ৬৬০ বার নাড়াতে পারে তার দু’টি ডানা। আর তাতেই তৈরি হয় ওই বোঁ শব্দ। মশারা ডানা নাড়িয়ে শুধু বোঁ বোঁ আওয়াজই তোলে না, উড়েও। এক-এক মশা উড়ে এক রকম। জানার কথা, একমাত্র মেয়ে মশারাই খায় মানুষের রক্ত। থুড়ি, ভুল বললাম, বিভিন্ন পশু-পাখির রক্তও খায় এই খুদে সন্ত্রাসবাদীরা। খেতে তো হবেই। কারণ রক্ত না-খেলে ওদের ডিম পুষ্ট হয় না। আর ডিম পুষ্ট না হলে তা থেকে জন্মায় না লার্ভা।

কাজেই শুধুমাত্র নিজেদের বংশ রক্ষার তাগিদেই একফোঁটা প্রাণীজ রক্ত মশাদের চাই-ই-চাই। আর সেই একফোঁটা রক্ত জোগাড় করতেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় এরা। ওড়ার ক্ষমতা সকলের সমান নয়। কারও বেশি। কারও কম। কারও মাঝারি।

মশার জগতে ওড়ার ব্যাপারে একেবারে নাম্বার ওয়ান ওস্তাদ হল অ্যানোফিলিস মিনিমাস। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে বেড়ানো এই মশাটি এমনিতে উড়ে ২ কিলোমিটার। তবে হাতের কাছে মানুষ বা তার পছন্দের কোনো পশু-পাখি না-পেলে রক্তের সন্ধানে সে উড়ে যেতে পারে ১২ কিলোমিটার। শুধু উড়ান ক্ষমতার প্রশ্নেই নয়, বুদ্ধিবৃত্তিতেও অ্যানোফিলিস মিনিমাসের ধারে-কাছে আসে না অন্য কোনো ম্যালেরিয়া বাহক। রক্ত সংগ্রহের কাজে কোনোরকম বিঘœ যাতে না-ঘটে, তা নিশ্চিত করতে সন্ধে ৬ টা থেকে ৭ টার মধ্যেই মানুষের উপর চড়াও হন ইনি। তাও আবার ঘরের ভিতরে ঢুকে নয়, ঘরের বাইরে। কাজেই অ্যানোফিলিস মিনিমাসকে মশারির জুজু দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ম্যালেরিয়া রোধের কাজ করছেন যাঁরা, তাঁদের কাছে অনুরোধ দয়া করে সেখানকার বাসিন্দাদের মশারি টাঙিয়ে শোওয়ার কথা আর বলবেন না। তাতে রোগের সমস্যা মিটবে না।

গোসাবা ও সুন্দরবনসহ দেশের সমুদ্রোপকূলবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ম্যালেরিয়া ছড়ায় অ্যানোফিলিস সান্ডাইকাস। মশাদের উড়ান-ট্র্যাকে এর স্থান অ্যানোফিলিস মিনিমাসের পরেই। নোনা পানিতে জন্মানো এই মশাটি রক্তের সন্ধানে তার জন্মস্থান থেকে উড়ে যেতে পারে ৯ কিলোমিটার। অ্যানোফিলিস মিনিমাসের মতো অ্যানোফিলিস সান্ডাইকাসও বেশি কামড়ায় ঘরের বাইরে। কামড়ানো মাহেন্দ্রক্ষণ এর রাত ৯ টা থেকে ২ টা। সুতরাং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো সমুদ্র উপকূলবর্তী জায়গাগুলোতেও মশারি দিয়ে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ঠেকানো মুশকিল। সমস্যা মোকাবিলায় খুঁজতে হবে অন্য কোনো পথ। তার জন্য চাই ভাবনা, গবেষণা ও পরিকল্পনা।

দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদসহ ভারতের বড়ো বড়ো শহরের মতো ঢাকা শহরেও ম্যালেরিয়া মূল বাহন অ্যানোফিলিস স্টিফেনসাই। এক জোড়া ধূসর ডানার প্রত্যেকটির কিনারা বরাবর কালো রঙের ফুটকি। দেখতে ভারী সুন্দর। শহরের রানি মশা বলা যায় নিঃসন্দেহে। এর ওড়ার ক্ষমতা ২ কিলোমিটার ৫০০ মিটার। সহজ করে বললে যার অর্থ দাঁড়ায়, ঢাকার ম্যালোরিয়া অধ্যুষিত কোনো এলাকায় অ্যানোফিলিস স্টিফেনসাইয়ের একটা আঁতড়ঘরকেও জিউয়ে রাখলে সে আঁতুড়ঘরের চারপাশে আড়াই কিলোমিটার ব্যাসার্র্ধ বরাবর যে কোনো নাগরিক যে-কোনো সময় পড়বে এই রক্তলোভী রানীর খপ্পরে। কাজেই রানির উৎস বিনাশ ছাড়া ঢাকা শহর থেকে ম্যালেরিয়া দূর করার আর কোনো শর্টকাট পথ নেই। সুতরাং দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংশয় আর নয়। সবাই একসঙ্গে একটু নড়েচড়ে বসুন এবার।

যে মশাটির সংখ্যা সবথেকে বেশি, সেই কিউলেক্স কুইনকুই ফ্যাসিয়েটাস এর ডানার জোরও কিন্তু কম নয়। মানুষের একফোঁটা রক্ত জোগাড় করার জন্য সে উড়ে যেতে পারে ৫ কিলোমিটার। ফাইলেরিয়ার প্রধান বাহন এই মশা জন্মায় মূলত নালা নর্দমা, ডোবা, খোলা কাঁচা-পাকা ড্রেন, গ্যালিপিট, খাল ইত্যাদির বদ্ধ নোংরা পানিতে। প্রতি বছর মার্চ মাসে মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে যে মশা, সে আর কেউ নয়, এই কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়েটাস। আসল কথাটা হল, কুডুলটা মারতে হবে গোড়ায়। তবেই কমবে মশার সমস্যা। দুঃখের বিষয়, এই অতি সহজ কথাটা আমাদের অনেকেই আজও বোঝেন না।

মশাদের মধ্যে সবথেকে কম উড়ে এইডস ইজিপ্টাই। মেরেকেটে ১০০ মিটার। ঢাকা-সহ দেশ-বিদেশের বহু শহরে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রধান পান্ডা মশা। এখন ষোলোআনা শহুরে। মানুষে মানুষে কিলবিল করা তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন শহরে মহাসুখেই দিন কাটাচ্ছে এইডিস ইজপ্টাই। এর আতুঁরঘর যেখানে, সেখানেই লোকের ভিড় চাইলে ১ মানুষ, মেলে ১০ টা। কোনো রকম কসরত ছাড়াই রক্তপ্রাপ্তির ঢালও সুযোগ। সহজে সব পেয়ে গেলে কুঁড়ে হতে দোষ কোথায়। ইডিস ইজিপ্টাই-এর মত কম ওড়ার কারণ তো এটাই।

ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার আর এক বাহন এইডিস অ্যালবোপিকটাস। বেশি দেখা যায় গাছপালা অধ্যুষিত শহরতলি এবং গ্রামাঞ্চলে। শহরের চেয়ে গ্রামে লোকসংখ্যা কম থাকে বলে সেখানে রক্ত জোগাড় করা খুব সহজ নয়। এদিক ওদিক একটু ওড়াউড়ি না-করলে মুশকিল। বিষয়টা তার জানা। তাই তার জন্মস্থানে থেকে ৬০০ মিটার দূরে উড়ে গিয়েও মানুষের চামড়ায় শুঁড় ফুকিয়ে রক্ত টেনে নিয়ে আসতে শিখেছে এইডিস অ্যালবোপিকটাস।

মোদ্দা কথা হল, মশারা উড়ে। আর উড়ে বলেই এদের দেহে সওয়ার হয়ে ম্যালেনিয়া, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। সুতরাং সবাই সাবধান! মশা মারতে দয়া করে কেউ আর ধোঁয়া দিবেন না। ধোঁয়া দেওয়ার কথা কেউ আর বলবেনও না। মনে রাখবেন, ধোঁয়ায় সমস্যা মেটে না, বাড়ে। ধোঁয়া দিলে রোগ-জীবাণুবাহী মশা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় উড়ে গিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দেয়। সমস্যা মেটানোর একটাই পথ, মশাদের উৎস বিনাশ করা। দেশের বিভিন্ন কর্পোরেশন এবং মিউনিসিপ্যালিটির প্রশাসকেরা এই কথাটা একবার ভেবে দেখাতে পারেন সাধারণ নাগরিকদের মঙ্গলার্থে। আফতাব চৌধুরী সাংবাদিক-কলামিস্ট।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ