ঋণ পরিশোধের বিষয়ে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারো কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পর তা পরিশোধের আন্তরিক ইচ্ছা থাকা যেমন: জরুরি, তেমনি পাওনাদারের অধিকার নষ্ট করাও গুরুতর বিষয়। তবে ঋণ পরিশোধ করতে চাইলেও যদি দীর্ঘ চেষ্টা করে পাওনাদারকে খুঁজে পাওয়া না যায়, সে ক্ষেত্রে কী করবেন—এ বিষয়ে ইসলামি শরিয়তে কিছু নির্দেশনা রয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ নেয় তা পরিশোধ করার নিয়তে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৩৮৭)।
এ থেকে বোঝা যায়, ঋণ নেওয়ার সময় থেকেই তা পরিশোধের আন্তরিক নিয়ত থাকা জরুরি। অন্যদিকে, ইচ্ছাকৃতভাবে পাওনাদারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, তাকে এড়িয়ে চলা কিংবা খুঁজে বের করার ভান করা গ্রহণযোগ্য নয়।
পাওনাদারকে খুঁজে না পাওয়া গেলে প্রথম দায়িত্ব হলো তাকে খুঁজে বের করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তার শেষ জানা ঠিকানা, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন ও অন্যান্য সম্ভাব্য মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে। পাওনাদার মারা গিয়ে থাকলে তার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে হবে।
ইসলামি ফিকহের আলোচনায় বলা হয়েছে, পাওনাদার বা তার উত্তরাধিকারীদের খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা করা যাবে না। সব ধরনের যুক্তিসংগত চেষ্টা করেও তাদের সন্ধান না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অর্থ তার পক্ষ থেকে সদকা করার কথা উল্লেখ করেছেন আলেমরা।
দীর্ঘ চেষ্টা করেও পাওনাদার বা তার ওয়ারিশদের কোনো সন্ধান পাওয়া না গেলে, পাওনা অর্থ গরিব-দুঃখী বা অন্য কোনো বৈধ জনকল্যাণমূলক কাজে সদকা করা যেতে পারে। এ সময় নিয়ত থাকবে—অর্থটি প্রকৃত পাওনাদারের পক্ষ থেকে সদকা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ফতোয়া-ভিত্তিক ইসলামি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মালিক বা পাওনাদারকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হলে তার পক্ষ থেকে সেই অর্থ সদকা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পরে যদি মালিক বা তার ওয়ারিশের সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি তাদের জানাতে হবে।
পাওনাদারের পক্ষ থেকে সদকা করার পর ভবিষ্যতে তিনি বা তার বৈধ ওয়ারিশের সন্ধান পাওয়া গেলে বিষয়টি তাদের জানানো উচিত। তারা যদি আগে করা সদকাকে গ্রহণ না করেন এবং নিজেদের পাওনা অর্থ দাবি করেন, তাহলে তাদের পাওনা পরিশোধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে—এমন মত ইসলামি ফতোয়ায় উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু সদকা করে নিজের দায় সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে ধরে নিয়ে ভবিষ্যতে পাওনাদার বা তার ওয়ারিশের অধিকার অস্বীকার করা ঠিক হবে না।
ঋণের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, “মুমিনের আত্মা তার ঋণের কারণে আটকে থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।” (জামে তিরমিজি, হাদিস ১০৭৮)।
আরেক হাদিসে এসেছে, আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার মাধ্যমে মানুষের অনেক গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায়, তবে ঋণ এর ব্যতিক্রম। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৮৬)।
এ কারণে ইসলামি দৃষ্টিতে ঋণকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ঋণগ্রহীতার উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী দ্রুত তা পরিশোধ করা এবং পাওনাদারের অধিকার নিশ্চিত করা।
পাওনাদারকে খুঁজে পাওয়া না গেলে প্রথমে তাকে বা তার ওয়ারিশদের খুঁজে বের করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। দীর্ঘ চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো সন্ধান না মিললে আলেমদের ফতোয়া অনুযায়ী তার পক্ষ থেকে ওই অর্থ সদকা করা যেতে পারে। তবে ভবিষ্যতে পাওনাদার বা তার ওয়ারিশের সন্ধান পাওয়া গেলে তাদের দাবি মেটানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ইসলামের মূল শিক্ষা হলো—ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা, সততা এবং পাওনাদারের অধিকার রক্ষা করা। শুধু পাওনা এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কাউকে খুঁজে না পাওয়ার অজুহাত দেওয়া ইসলামি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কারো উপর তার ভাইয়ের কোনো প্রকার দাবি থাকলে সে যেন তা থেকে মুক্ত হয়ে যায়। কেননা সেখানে (কিয়ামত দিবসে বা পরকালে) কোনো দীনার-দিরহাম (টাকা-পয়সা) থাকবে না। তার অন্যায়ের সমপরিমাণ নেকি তার ভাইয়ের জন্য কেটে নেয়ার আগেই। তার যদি নেকি না থাকে তাহলে তার ভাইয়ের গুনাহগুলো নেয়া হবে, অতঃপর তার উপরে চাপিয়ে দেয়া হবে।
সুতরাং করণীয় হল, পাওনাদারকে কিংবা তার ওয়ারিশ অথবা নিকটাত্মীয়দের খুঁজে বের করা। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাউকে না খুঁজে পাওয়া সংশয় দূর না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করা। এর পরেও যদি কাউকে খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে পাওনাদারদের পক্ষ থেকে ওই পরিমাণ টাকা গরীব-দুঃখীকে সাদাকাহ করে দিবেন। আর মনে মনে এই নিয়ত রাখা যে, আল্লাহ তায়ালা যেন এই দানের সওয়াব পাওনাদারকে পৌঁছে দেন। ওই টাকা নিজেদের গরিব আত্নীয়-স্বজনকে দান করলেও অসুবিধা নেই। আর যদি দাতা সাদাকাহ গ্রহণের উপযুক্ত হন তাহলে নিজেও উক্ত টাকা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে পরবর্তীতে মালিক এসে দাবি করলে তাকে উক্ত টাকা ফেরত দিতে হবে।



