শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬
২৩শে আশ্বিন, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

‘গিরি’ থেকে ‘প্রতিমা’, তারপর ‘ঝলমল’: এক আগুনে শেষ শত বছরের সংস্কৃতি

‘গিরি’ থেকে ‘প্রতিমা’, তারপর ‘ঝলমল’: এক আগুনে শেষ শত বছরের সংস্কৃতি...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২:৩৬ পিএমসর্বশেষ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২:৩৬ পিএম
‘গিরি’ থেকে ‘প্রতিমা’, তারপর ‘ঝলমল’: এক আগুনে শেষ শত বছরের সংস্কৃতি

// Copy link functionality const copyBtn = document.querySelector('.copy-link-btn'); if (copyBtn) { copyBtn.addEventListener('click', function() { const url = this.getAttribute('data-url'); navigator.clipboard.writeText(url).then(function() { // Show success message const originalText = copyBtn.innerHTML; copyBtn.innerHTML = 'Copied!

সালটা ১৯৬৫। চারদিকে উর্দু সিনেমার দাপট। সেই সময়ে ঢালিউডে মুক্তি পায় লোকগাথাভিত্তিক বাংলা চলচ্চিত্র ‘রূপবান’। তখন রক্ষণশীল পরিবারগুলোতে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার ওপর ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ‘রূপবান’ দেখার আকর্ষণ আটকে রাখতে পারেননি মো. আলী জিন্নাহ। নিষেধের দেওয়াল ভেঙে বন্ধুদের সঙ্গে লুকিয়ে ম্যাটিনি শো দেখতে ‘ঝলমল’ সিনেমা হলে গিয়েছিলেন তিনি।

স্মৃতির পাতা উল্টে ‘ঝলমল’ সিনেমা হলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই কৈশোরের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে ৭১ বছর বয়সী প্রকৌশলী ও সাংস্কৃতিক কর্মী মো. আলী জিন্নাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হলের সামনে সেদিন প্রচুর ভিড় ছিল। টিকিটের জন্য সবাই লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল।

জিন্নাহর মতো ময়মনসিংহ শহরের আরও অনেক প্রজন্মের পদচারণায় মুখর থাকতো এই সিনেমা হল। পর্দায় নায়ক-নায়িকার প্রেম, খলনায়কের পরাজয় কিংবা কোনো সিনেমার শেষ দৃশ্যে হাততালি—সব মিলিয়ে সত্যিই ঝলমলে থাকতো এই হলটি।

কিন্তু, সময়ের সঙ্গে আজ এই সিনেমা হলটি শুধু একটি পুড়ে যাওয়া কাঠামো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জিন্নাহ বলেন, ‘খবরটা শুনে শিউরে উঠেছিলাম। কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না ঝলমলের এই নির্মম পরিণতি।

পুড়ে যাওয়া হলের জায়গায় কোনো বাণিজ্যিক ভবন বা শপিং মল গড়ে তোলার পক্ষে নন জানিয়ে জিন্নাহ বলেন, ‘গৌরীপুরের জমিদার আমলের ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে এই জায়গায় সরকারি অর্থায়নে “গৌরীপুর ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র” কিংবা একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্মারক ভবন করা উচিত।

গত ৭ অক্টোবর ভোররাতে আগুনে পুড়ে যায় ময়মনসিংহের গৌরীপুরের শতবর্ষী ‘ঝলমল’ সিনেমা হল। আগুন লাগার কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সিনেমা হলের পাশের সিলিন্ডারের গুদাম থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করা গৌরীপুরের রায়হান উদ্দিন সরকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘গৌরীপুর রাজবাড়ীর পঞ্চম জমিদারের ছেলে বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর সংগীত ও নাটকের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে এই নাট্যমঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

রায়হান জানান, কলকাতায় পড়াশোনা করার সময় সেখানকার ঐতিহ্যবাহী স্টার থিয়েটারের স্থাপত্য ও কাঠামোয় মুগ্ধ বীরেন্দ্র কিশোর রায় সেটারই অনুকরণে ‘গৌরীপুর নাট্যমন্দির’ থিয়েটার হলটি গড়ে তোলেন। উদ্বোধনী দিনে ঐতিহাসিক ‘শাহজাহান’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী ও গুণীজনদের পদচারণায় এক সময় মুখরিত থাকতো এই নাট্যমঞ্চ।

আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক আলী আহাম্মাদ খান আইয়ুব তার ‘ময়মনসিংহে রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে একে ‘গৌরীপুর নাট্য মন্দির’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আলী আহাম্মাদ খান আইয়ুব জানান, দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে সরকারের মালিকানায় হস্তান্তর হওয়ার পর নাট্যমঞ্চটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য লিজ বা ভাড়া দেওয়া হয়। প্রথম দিকে এটি ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রতিমা’ সিনেমা হল। শেষ পর্যন্ত নাম হয় ‘ঝলমল’ সিনেমা হল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত প্রায় ১৫ বছর ধরে হলটি বন্ধ ছিল। পরে ২০১৬ সালে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য এটি ভাড়া দেওয়া হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর গৌরীপুর জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

তবে, বারবার দাবি সত্ত্বেও ‘ঝলমল’ সিনেমা হলটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্নতত্ত্ব গবেষক সজল কোরায়ইশী।

তিনি বলেন, ‘এটি কেবল একটি ভবন বা সিনেমা হল ধ্বংস হয়ে যাওয়া নয়। এটি গৌরীপুরের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আমাদের প্রাচীন স্মৃতির ওপর এক মারাত্মক আঘাত।

পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির ময়মনসিংহ অঞ্চলের সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, ‘এই অগ্নিকাণ্ড আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি অবহেলাজনিত অপরাধ ও প্রশাসনের চরম গাফিলতির ফল।

সরকারি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ভবনটি উপজেলা প্রশাসনের অধীনে ছিল উল্লেখ করে তানসেন বলেন, ‘কীভাবে এমন একটি শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী কাঠের ভবনে চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের গোডাউন এবং দাহ্য কাঠের ফার্নিচার কারখানার অনুমতি দেওয়া হলো।

গৌরীপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আহমেদ তায়েবুর রহমান হিরণ বলেন, ‘এ ধরনের স্থাপনায় দুর্ঘটনা এড়াতে যে প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বাধ্যবাধতা রয়েছে সেগুলো ছিল কি না, তার জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দিতে হবে।

এ বিষয়ে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন জানান, সিনেমা হলটি বর্তমানে ১৬ জনের নামে লিজ দেওয়া আছে। প্রাথমিকভাবে লিজের শর্ত যথাযথভাবে না মানার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং সব লিজ গ্রহীতাদের শোকজ নোটিশও দেওয়া হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ