প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনে রোগীর অধিকার সংরক্ষণ, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং দায়িত্ব পালনের সময় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধান রাখার আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
রোববার (১১ অক্টোবর) ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন: নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক অনলাইন ওয়েবিনারে এ আহ্বান জানানো হয়। সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ), পাবলিক হেলথ ল ইয়ার্স নেটওয়ার্ক ও সিটিজেন নেটওয়ার্ক-সিনেটের উদ্যোগে আয়োজিত ওয়েবিনারে রোগীর অধিকার, চিকিৎসায় অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহি এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
বক্তারা বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনে রোগীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিটি রোগীর মানসম্মত ও বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার, রোগের অবস্থা ও চিকিৎসা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানার অধিকার, চিকিৎসার ক্ষেত্রে সম্মতি প্রদান, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার বিষয়গুলো আইনে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
তাঁরা বলেন, চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কিংবা রোগীর অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, মূল্যায়ন ও নিষ্পত্তির জন্য স্বচ্ছ, স্বাধীন ও সহজলভ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অভিযোগের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত রোগী বা তাঁর পরিবারের ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসার অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল, অনিবার্য জটিলতা এবং প্রকৃত চিকিৎসা অবহেলার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে উপযুক্ত ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে বক্তারা বলেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপ, জনবলসংকট, সীমিত অবকাঠামো ও জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। দায়িত্ব পালনের সময় শারীরিক নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা এবং সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য আইনে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার, দায়িত্ব এবং সুরক্ষার পরিধি স্পষ্ট করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা বিবেচনায় পৃথক সুরক্ষামূলক বিধান রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিধান যেন চিকিৎসায় অবহেলা, অনিয়ম কিংবা রোগীর অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তিতে বাধা সৃষ্টি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে রোগীর অধিকার রক্ষার নামে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ, অযৌক্তিক হয়রানি কিংবা দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টির ঝুঁকি মোকাবিলায় ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়া থাকতে হবে।
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, মানুষের বাড়ির কাছেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে রোগীর অধিকার সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অ্যাডভোকেট মমতাজ মৌ স্বাস্থ্য আইনে প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমনমূলক সেবা অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বি-স্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব।
স্বাস্থ্য আন্দোলনের আহ্বায়ক ও সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির আলোকে সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। অ্যাডভোকেট শাহনেওয়াজ পাটোয়ারী স্বাস্থ্য আইনে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ব্যারিস্টার নিশাত মাহবুব বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাস্থ্যকে জীবনের অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয় নীতি ও কার্যক্রমে স্বাস্থ্য অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে প্রত্যেক নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত হয়।
বক্তারা বলেন, রোগী ও স্বাস্থ্যসেবাদানকারী—উভয় পক্ষের অধিকার, দায়িত্ব ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কার্যকর স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন সম্ভব। এ লক্ষ্যে আইনে রোগীর অধিকার সনদ, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নিষ্পত্তির নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় সুরক্ষামূলক বিধান এবং স্বাস্থ্যসেবার মান পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির কার্যকর কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেন তারা।
ওয়েবিনারে আরও অংশ নেন ডা. আমিনুল হাসান, ডা. মাহবুব মুনতানবী, নাটাবের প্রকল্প পরিচালক ফিরোজ আহমেদসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিএলপিএর সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট কামরুনন্নিছা মুন্না। এতে সভাপতিত্ব করেন একে এম মাকসুদ।
ইসলামী বিধান না জানার কারণে কারো সাথে প্রেম করে পরবর্তীতে পারিবারিকভাবে বিয়ে করা চেষ্টা করা প্রসঙ্গে।



