সাতক্ষীরার দেবহাটায় দফায় দফায় মারধরের শিকার হয়ে মারা গেছেন ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যু হলেও পরদিন বুধবার (১৪ অক্টোবর) এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর থেকে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন জানিয়েছেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীমের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
পরে স্থানীয়রা তাকে মারধর করছে, এমন খবর পেয়ে পুলিশ সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হন এবং শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। খবর বিবিসি বাংলার।
তিনি বলেন, রাত সাড়ে আটটায় উত্তেজিত জনতা বলেন আর তৌহিদী জনতা- যে নামেই হোক, তারা এসে আবার মারধর করে।
পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেলে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে নিহতের পরিবারের দাবি, ‘পরিকল্পিতভাবে’ শামীমকে হত্যা করা হয়েছে।
শামীমের ছোটো ভাই তাওছিফ রহমান সাগর বলেন, উসকানিমূলক একটা ভিডিও দিয়ে মানুষকে তার বিরুদ্ধে ক্ষ্যাপায় তুলে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে।
এ সময় শামীমকে মানসিক ভারসাম্যহীন দাবি করে সাগর বলেন, আইন যদি তাকে শাস্তি দিত তাহলে আমরা মেনে নিতাম। কিন্তু আমার ভাইকে এভাবে বিনা বিচারে পিটায় মারবে কেন?
এদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সোমবার প্রথম দফায় শামীমের বাড়িতে হামলা করা হয় বলে জানান সাগর। এ সময় স্থানীয় জামায়াতের একদল নেতাকর্মী লোকজন জড়ো করে মব সৃষ্টি করে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে স্থানীয় জামায়াত নেতা কামরুল ইসলাম গাজী সেই দাবি অস্বীকার করে বলেন, ডাক্তারের চেম্বারের পাশে সাধারণ মানুষ তারে মারধর করে। এই পর্যন্ত জানি আমরা।
জামায়াতের কেউ ছিল কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, না...এলাকার সবাই ছিল।
এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুর তিনটা পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি। তবে আজকের মধ্যেই পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন নিহত শামীমের ছোটো ভাই সাগর।
তাওছিফ রহমান সাগর জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছিলেন শামীম। বেশ কয়েক বছর আগে বাসে যাতায়াতের সময় ‘অজ্ঞান পার্টির’ লোকজন তাকে কিছু একটা খাইয়ে দিলে পরিবারের সদস্যরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে।
চিকিৎসা নেওয়ার পর শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মাঝেমধ্যে ‘মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত’ আচরণ করতেন শামীম। এ কারণে তার প্রথম সংসার ভেঙ্গে যায় বলেও জানান সাগর। সেই ঘরে তার আট বছরের একটি ছেলে আছে।
পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন শামীম। সেই সংসারে সাগরের সাত মাসের আরেকটি ছেলে রয়েছে।
মবের ঘটনার সূত্রপাত হয় সোমবার। পরিবার বলছে, সেদিন স্ত্রীর সঙ্গে শামীমের পারিবারিক কলহ হয়। এ সময় পাড়া-প্রতিবেশীদের কেউ কেউ শামীমকে উসকে দেয় এবং শামীমের বলা কথা রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেয় বলে দাবি করেন সাগর।
অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়লে দলবদ্ধ লোকজন তাদের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালায়। সেই ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতের একদল নেতাকর্মীরও সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানান সাগর।
তিনি বলেন, বাসায় যেদিন প্রথম হামলা হয়, সেদিন যারা আসছিলো তারা সবাই জামায়াতে ইসলামের সমর্থক এবং কর্মী। মাঠ পর্যায়ের যারা স্থানীয় নেতা, সভাপতি, সেক্রেটারি, এককথায় ওনাদের কমিটিতে যারা আছে। এরা যখন প্রথম হামলা করে, আমাদের বাজারে জামায়াতের যে অফিস আছে, ওখানে সংগঠিত হয়ে ওখান থেকে এসেই প্রথম হামলা করা হয়।
তবে এই দাবি অস্বীকার করেছেন দুই নাম্বার পারুলিয়া ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল ইসলাম গাজী।
তিনি বলেন, শামীমের বাড়িতে বউ নিয়ে ‘গ্যাঞ্জাম’ হয়।
কামরুল ইসলাম গাজী বলেন, ও রাসূল এবং আল্লাহর নামে কটূক্তি করে। এটা মোটামুটি আমাদের মাঠঘাটে ভাইরাল হয়ে যায়।
পরে শামীম বিষ খেলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তাকে মারধর করার কথা শুনেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে পরিবারের দাবি, সোমবার বাড়িতে হামলা হবার পর রাতের দিকে বিষ পান করেন শামীম। পরিবারের সদস্যরা তাকে স্থানীয় এক ডাক্তারের চেম্বারে নেওয়ার পর চিকিৎসক তার অবস্থা শঙ্কামুক্ত বলে জানান। তবে দেখভালের জন্য সেখানে কিছুটা সময় রাখতে বলেন।
কিন্তু মঙ্গলবার বিকালে সেই ডাক্তারের চেম্বারেও চড়াও হয় মব। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তৃতীয় দফায় সেখানে গিয়েও তার ওপর আরেক দফায় হামলা চালানো হয়।
পরে পুলিশ তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেলে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মঙ্গলবার নিজ ফেসবুক পেইজ থেকে লাইভ করেন মো. ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয়ভাবে নিজেকে মুফতি পরিচয় দেওয়া ওই লোক দুপুর সাড়ে তিনটা থেকে একের পর এক উসকানিমূলক ভিডিও প্রকাশ করেন।
সেসব ভিডিওতে কখনও তাকে জনসাধারণকে ডাক দিতে শোনা যায় তো কখনও একদল মানুষকে নিয়ে মিছিল করতে দেখা যায়।
এমনকি বুধবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মৃত শামীমের ছবি প্রকাশ করে উল্লাসও প্রকাশ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে ইমোতে ছড়িয়ে পড়া অডিওটি ফেসবুক উপযোগী করে ছাড়ার জন্য সাহায্য চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন আমিনী এবং দুপুরের দিকে সেই অডিও ফেসবুকে দেন।
কিন্তু এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন বলেন, আমাদের এগুলো নজরে এসেছে। আমরা আমাদের কার্যক্রম করছি। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।



