রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
৩ঠা কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

কম্বোডিয়ায় প্রতারণার ফাঁদে আটকে ১৮০০ বাংলাদেশি, সামনে ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা

কম্বোডিয়ায় প্রতারণার ফাঁদে আটকে ১৮০০ বাংলাদেশি, সামনে ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩:২১ পিএমসর্বশেষ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩:২১ পিএম
কম্বোডিয়ায় প্রতারণার ফাঁদে আটকে ১৮০০ বাংলাদেশি, সামনে ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা

সাড়ে তিন বছর ধরে কম্বোডিয়ায় আটকে আছেন মোহাম্মদ জামিল ওরফে সেন্টু। কাজ নেই, ভিসার মেয়াদও শেষ। দেশে ফেরার জন্য বারবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি তিনি।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরের বাসিন্দা সেন্টু বলেন, ‘বারবার প্রতারণার শিকার হয়েছি। দু-তিনবার টিকিট কিনেছি, কিন্তু তাতে শুধু টাকাই খুইয়েছি। টিকিট কেনার টাকাও এখন আর নেই।

বর্তমানে অন্য বাংলাদেশিদের জন্য মাঝেমধ্যে রান্না করে দেন সেন্টু। বিনিময়ে খাবার পান।

ভালো বেতনের কাজের প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় গিয়ে আটকে পড়া শত শত বাংলাদেশিদের একজন সেন্টু। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেককে অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করে নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন কেউ কেউ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ বাংলাদেশি দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা এবং ভুক্তভোগীদের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠন অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশনের হিসাবে, কম্বোডিয়ায় এখনো ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি আটকে আছেন।

সংগঠনটি জানায়, কম্বোডিয়ার অভিবাসন আইনে নির্ধারিত সময়ের বেশি সময় দেশটিতে থাকলে জরিমানার বিধান রয়েছে। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে এ বিষয়ে সমাধান না হলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশির দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

দেশে ফেরার চেষ্টায় থাকা এই বাংলাদেশিদের দুর্ভোগের বিষয়টি সামনে আসে গত ৩ সেপ্টেম্বর। সেদিন কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের বিমানবন্দরে দেশ ছাড়ার চেষ্টার সময় ৩২ বাংলাদেশিকে আটক করে দেশটির অভিবাসন পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, তাদের কয়েকজন অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিবাসনসংক্রান্ত অনিয়ম ও যাচাই-বাছাইয়ের সময় অন্যান্য জটিলতা দেখা দেওয়ায় তাদের আটক করা হয়।

আটক ৩২ জনের মধ্যে দুজনকে মুক্তি দেওয়া হলেও বাকি ৩০ জনকে দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার পর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছিল।

থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) জহির ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, বাকি ৩০ জন আগামী দু-একদিনের মধ্যে দেশে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তাদের দেশে ফেরার টিকিটের খরচ নিজেদেরই বহন করতে হবে।

তবে টিকিট কেনার সামর্থ্য না থাকা ব্যক্তিদেরসহ আরও কয়েকশ বাংলাদেশির দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। দেশটিতে বাংলাদেশের কনস্যুলার কার্যক্রম পরিচালনা করে ব্যাংককে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন।

জহির ইমাম জানান, কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া ১ হাজার ৭৯৬ বাংলাদেশির বিষয়ে ফোনকল, ই-মেইল, সরাসরি আবেদন ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে তাদের কাছে অনুরোধ এসেছে।

তিনি বলেন, গত জুলাই থেকে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তবে তালিকায় থাকা সবার নাম স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে তালিকাভুক্ত প্রত্যেকের বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতি সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জহির ইমাম জানান, দেশে ফেরার আবেদন করা বাংলাদেশিরা মানব পাচারের শিকার কি না, অথবা অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্র ও মানব পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা যাচাই করতে কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। যাদের মানব পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, তাদের দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

এই যাচাইপ্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রয়েছে। আবার তা চালু করার জন্য বাংলাদেশ মিশন অনুরোধ জানিয়েছে।

অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশনের হিসাবে, কম্বোডিয়ায় আটকে থাকা ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশির মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। অভিবাসনের এই অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে তাদের জরিমানা গুনতে হবে।

সংগঠনটির সভাপতি ও সহপ্রতিষ্ঠাতা আল আমিন নয়ন বলেন, ওই জরিমানা-সংক্রান্ত শর্ত, কারা এর আওতায় আসবেন, জরিমানা মওকুফের সুযোগ রয়েছে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

নয়ন জানান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর কাছে আজ রোববার একটি স্মারকলিপি দেবে সংগঠনটি। এর অনুলিপি দেওয়া হবে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও।

স্মারকলিপিতে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফেরানো, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রত্যেকের পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই, জোর করে কোনো অপরাধে জড়িত হতে বাধ্য করা হলে তার জন্য শাস্তি না দেওয়া, পুনর্বাসন এবং মানব পাচারচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হবে।

বেসরকারি চাকরিজীবী কবির হোসেন বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে তার ২৪ বছর বয়সী ছেলে শাওন কম্বোডিয়ায় যায়। এরপর থেকে তার পেছনে প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ করেছেন তিনি।

শাওনকে আইটি বিভাগে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা বেতন পাবেন তিনি। কম্বোডিয়া যাওয়ার জন্য খরচ হওয়া ৬ লাখ টাকার বড় অংশই ধার করে জোগাড় করেছিল পরিবারটি। কিন্তু শাওন দেশে কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। উল্টো তার থাকা-খাবারসহ অন্যান্য খরচের জন্য বারবার টাকা পাঠাতে হয়েছে কবিরকে।

কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখন বুঝতে পারছি না, এই ঋণ কীভাবে শোধ করব। ছেলেকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে গিয়ে দুইবার টাকা খরচ করেও কাজ হয়নি, টাকাও ফেরত পাইনি। আবার টিকিট কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করি ১৯ বা ২০ অক্টোবর শাওন দেশে ফিরতে পারবে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় কাজের জন্য ১৫ হাজার ৯৬৩ জন বাংলাদেশি কর্মী ছাড়পত্র পেয়েছেন।

তবে ছাড়পত্র দেওয়ার পরও নিয়োগকর্তা, কাজের পরিবেশ ও অবস্থান সম্পর্কে কার্যকর নজরদারির ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান।সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে প্রায় ১৬ হাজার মানুষকে সেখানে পাঠানো হয়েছে। অথচ তারা কোথায় আছেন, কী করছেন, তা জানার কোনো ব্যবস্থা আমাদের নেই।

কম্বোডিয়া ছাড়তে চাওয়া বাংলাদেশিদের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বৈধ চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সেখানে নেওয়া হয়েছিল। পরে বাধ্য করা হয় সাইবার প্রতারণার কাজে। অনেকের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, হুমকি দেওয়া, এমনকি অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

গত ৮ অক্টোবর কম্বোডিয়া থেকে তিন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে আনা হয়। তাদের একজন ঝিনাইদহের ২৩ বছর বয়সী সোহাগ আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর তিনি একটি প্রতারণাকেন্দ্রের চক্রে আটকে পড়েছিলেন।

শরিফুল হাসান বলেন, ‘কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের শনাক্ত করে তাদের প্রত্যেকের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। একইসঙ্গে তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ