বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে রাজপথের নেতা, সেখান থেকে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী—ইশরাক হোসেনের উত্থান হয়েছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। ‘বাপকা বেটা’ হওয়ার বাসনা থেকেই নিজেকে ঘোষণা করেছিলেন ‘জনতার মেয়র’। তবে একের পর এক বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তার। অবশেষে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে পিস্তল হাতে ‘দাবাংগিরি’র ঘটনায় শেষ হয়ে গেল মন্ত্রিত্ব।
৩৯ বছর বয়সী ইশরাকের বাবা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র। পুরান ঢাকায় তার শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর বাবার মৃত্যুর পর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন ইশরাক।
পেশায় ব্যবসায়ী ইশরাক প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন বিদেশে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রাজপথের আন্দোলন, দলীয় কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে তরুণ নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক। আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফল চ্যালেঞ্জ করে আইনি লড়াই শুরু করেন। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলেও শপথ গ্রহণ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে জয়ী হন ইশরাক। প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই পান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। কিন্তু আট মাসের মাথায় ‘আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন কাণ্ডে’ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হলো তাকে।
রাজনীতিতে ইশরাক হোসেনের উত্থান, বিতর্ক আর বিদায়ের এই গল্পই ‘ইশরাকনামা’।
২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশে পুলিশের লাঠিপেটায় আহত এক কর্মীকে ছিনিয়ে নেন ইশরাক। এ সময় তিনি সামান্য আহতও হন।
ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন তিনি। পরে নিজের ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রকাশ করে ইশরাক লেখেন, লাঠিচার্জ কিংবা কামানের গোলা—যে পরিস্থিতিই আসুক, জীবন থাকতে দলের কোনো কর্মী-সমর্থককে নিয়ে যেতে দেবেন না।
ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জীবনের ‘ট্রাম্পকার্ড’ হয়ে ওঠে।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের পর দলটির নয়াপল্টন কার্যালয়ে হাজির হন জাহিদুল ইসলাম ওরফে মিয়া আরেফি। নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ওই সময় তার পাশে বসেছিলেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী।
পরদিন বিমানবন্দর থেকে আরেফিকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় পল্টন থানায় করা মামলায় ইশরাক, আরেফি ও সারওয়ার্দীকে আসামি করা হয়। মামলার অভিযোগ, আরেফিকে মিথ্যা পরিচয়ে বক্তব্য দিতে সহযোগিতা করেন অন্য দুই আসামি।
এই ঘটনায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে বিএনপি। দলটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, আরেফির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত নয়। পরে ফেসবুক লাইভে এসে দুঃখ প্রকাশ করেন ইশরাক।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মেয়র পদ নিয়ে ইশরাকের আইনি লড়াই নতুন মোড় নেয়। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ের পরও শপথ নিতে না পারায় ২০২৫ সালের মে মাসে তার সমর্থকেরা নগর ভবন ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে ফটকে তালা দেওয়া হলে জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুনিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্সসহ নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়।
ইশরাকও আন্দোলনে যোগ দিয়ে কঠোর অবস্থান নেন। শপথের ব্যবস্থা না হলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুঁশিয়ারি দেন। তার যুক্তি ছিল, আদালতের রায় কার্যকর এবং ঢাকাবাসীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
সমর্থকেরা এই আন্দোলনকে তার রাজনৈতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখলেও জনভোগান্তি তৈরি হওয়ায় সমালোচনা বাড়ে। দলের ভেতরেও তার রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত মেয়রের চেয়ার তার অধরাই থেকে যায়।
২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর নবগঠিত ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের’ নেতাকর্মীদের নিয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে জড়ান ইশরাক। সে সময় তার ‘কনুইগুঁতো’র ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
পরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন ইশরাক।
তিনি জানান, কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব ছিল। শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় কে কোথায় দাঁড়াবেন, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে সারি ঠিক করতে গিয়ে তাকে কিছুটা কঠোর অবস্থান নিতে হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরেও আলোচনায় আসেন ইশরাক। নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে না পারায় নিজ দলের সদস্যদের সঙ্গে শপথ নিতে পারেননি তিনি। পরে জামায়াত ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সঙ্গে শপথ গ্রহণ করেন।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন তিনি। একই অবস্থান নেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের সময় সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিওতে ইশরাককে কিছুটা দ্বিধায় থাকতে দেখা যায়। একপর্যায়ে রুমিন ফারহানাকে উঠে যেতে দেখে তিনিও উঠে যান। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরসের জন্ম দেয়।
গত জুলাইয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। সেখানে যান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও।
রীতি অনুযায়ী, তিন বাহিনীর প্রধানেরা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে স্যালুট দেন। তবে দেখা যায়, তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে ইশরাকও স্যালুট দিচ্ছেন। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে অনেকে উপহাস করেন।
পরে এই বিষয়ে ফেসবুকে ইশরাক লেখেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা উঠলে শ্রদ্ধায় আমার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্যালুটে উঠে যায়। আমার হাত দিয়ে আমি বীর শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট দিয়েছি। হাত আমার, সম্মান জানিয়েছি সর্বজনশ্রদ্ধেয় বীরদের। দেশ আমার গণতান্ত্রিক; আমার ইচ্ছায় আমি স্যালুট দিয়েছি। যতবার ইচ্ছা হবে, যখন ইচ্ছা হবে, আমি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট জানাব।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনার আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে অভিযোগ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডার পর তারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
এমন পরিস্থিতিতে ইশরাক ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল না দিয়ে উত্তেজক বক্তব্য দিয়ে বসেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য এসেছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য এসেছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করেছেন? শহীদদের জন্য আপনারা কিছুই করেননি।
তার এ বক্তব্যের পর উত্তেজনা আরও বাড়ে। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ব্যক্তিদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
পিস্তল হাতে গাড়ি থেকে নামছেন ইশরাক। তার সঙ্গে থাকা লোকজন কয়েকজনকে ধরতে ছুটছেন। কাউকে লাথি দেওয়া হচ্ছে, পাশ থেকে গুলি করার হুমকিও শোনা যাচ্ছে। এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়। এটি মাদকবিরোধী অভিযানের নামে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় ইশরাকের সর্বশেষ ‘অ্যাকশন’।
বলিউডের ‘দাবাং’ সিনেমার পুলিশ চরিত্রের স্টাইলে অপরাধী ধরার এই অ্যাকশনই কাল হলো তার। সর্বমহলে প্রশ্ন ওঠে, মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীরা কি অস্ত্র হাতে এভাবে কাউকে তাড়া করতে পারেন?
এ ঘটনায় তীব্র সমালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে ডেকে পদত্যাগ করতে বলেন। পরে আজ সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন ইশরাক।



