বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
১৩ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

‘কোথায় গেলি বাপ আমার’, লরিচাপায় ছেলেকে হারিয়ে আহত বাবার আর্তনাদ

‘কোথায় গেলি বাপ আমার’, লরিচাপায় ছেলেকে হারিয়ে আহত বাবার আর্তনাদ...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৪০ পিএমসর্বশেষ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৪০ পিএম
‘কোথায় গেলি বাপ আমার’, লরিচাপায় ছেলেকে হারিয়ে আহত বাবার আর্তনাদ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) জরুরি বিভাগের সামনে মেঝেতে বসে চিৎকার করছিলেন আজহারুল ইসলাম। দুই পায়ে ব্যান্ডেজ, শরীরজুড়ে দুর্ঘটনার আঘাত। কিন্তু নিজের যন্ত্রণার দিকে তার খেয়াল নেই। কয়েক ঘণ্টা আগেও ছয় বছরের যে ছেলেটি তার চোখের সামনে ছিল, তাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।

‘ওরে বাপ আমার! ওরে রাকিব, তুই কোথায়? কোথায় চলে গেলি রে?’ সাংবাদিকদের কাছে দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

পাশেই বসে ছিলেন তার স্ত্রী ফাতেমা আক্তার। তারও মুখ ও হাতে দুর্ঘটনার ক্ষত। শোক আর মানসিক আঘাতে কথা বলার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন শূন্যে।

আজহারুলের পরিবারের জন্য গ্রামের বাড়িতে ফেরার আনন্দময় যাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। সোমবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের সীতাকুণ্ডে বিকল হয়ে যায় তাদের বাস। বাস থেকে নেমে অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীরা। এ সময় দ্রুতগতির একটি ট্যাংক-লরি তাদের চাপা দেয়। এতে ছয় বছরের রাকিবসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হন। আহত হন আরও ছয়জন।

রাকিব ছিল দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট। প্রথম শ্রেণিতে পড়ত সে। দুর্ঘটনায় তার বাবা আজহারুল ইসলাম ও মা ফাতেমা আক্তারও গুরুতর আহত হয়েছেন।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষক আজহারুল স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার মদন উপজেলায় যাচ্ছিলেন। ফাতেমা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেডের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। পরিবারটি পতেঙ্গা থানার নারকেলতলা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকত।

আজহারুলের ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে তারা নারকেলতলা থেকে নেত্রকোনাগামী শাপলা পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। রাত দেড়টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলা অতিক্রম করার সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বাসটি হঠাৎ থেমে যায়।

আজহারুল বলেন, ‘বাসটি হঠাৎ মাঝপথে থেমে যাওয়ায় অন্তত ২০ জন যাত্রী বাইরে নেমে বাসের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চালক ও তার সহকারী ত্রুটি সারানোর চেষ্টা করছিলেন। গরমে অস্বস্তি লাগায় আমিও স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে বাস থেকে নেমে সড়কের পাশে দাঁড়াই।

দুর্ঘটনার ঠিক আগে রাকিব তার বাবার কাছ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে ছিল।

আজহারুল বলেন, ‘আমার ছেলে রাকিব আমার থেকে মাত্র দুই গজ দূরে ছিল। আমি শুনছিলাম, চালক বাসের মালিকের সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। হঠাৎ একটি ট্যাংক-লরি দ্রুতগতিতে অন্য একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিকল বাসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে সজোরে ধাক্কা দেয়।

এরপরই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আজহারুল বলেন, ‘আমি দেখলাম, আমার ছেলে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। দুর্ঘটনায় আমার দুই পায়েই আঘাত লাগে। কিন্তু তখন পায়ের কোনো ব্যথাই অনুভব করিনি। চোখের সামনে শুধু রক্তের মধ্যে পড়ে থাকা আমার ছেলের মুখ ভাসছিল। তাকে বাঁচানোর জন্য চিৎকার করছিলাম। পরে স্থানীয় লোকজন আমাদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু তারা আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি।

বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পরিদর্শক শামীম আহমেদ জানান, দুর্ঘটনায় তিন নারী ও এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত অন্তত ছয়জনকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

দুর্ঘটনায় জড়িত ট্যাংক-লরিটি জব্দ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার পর চালক পালিয়ে যান।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ