কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। তবে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও আটকের বাইরেও একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আর তা হলো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং অন্যান্য অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পুলিশ সদরদপ্তর। এর পরিপ্রেক্ষিতে, সক্রিয় কিশোর গ্যাং, তাদের সদস্য এবং যারা এসব গ্যাং সংগঠিত করে বা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা (ফাইন্যান্স ও সুরক্ষা) দেয়, তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশের সব ইউনিটকে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান গত ১৭ অক্টোবর সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা ৮-১০ দিন আগেই দেশের সব পুলিশ ইউনিটকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছি। আশা করছি খুব দ্রুতই তালিকা পেয়ে যাব।'
'তালিকা হাতে পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে এবং যেসব এলাকায় কিশোর অপরাধ বেশি, সেখানে সমন্বিত অভিযানের জন্য একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে,' বলেন তিনি।
যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই তাদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল সায়েদুর রহমান বলেন, তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
তিনি স্পষ্ট করেন, যাদের কর্মকাণ্ড জননিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং যারা রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করবে, তাদের বিরুদ্ধেই মূলত এই অভিযান চালানো হবে।
এ নির্দেশনার আওতায় স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ (এসআরবি) পুলিশের সব ইউনিট কাজ করবে।
এসআরবির এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তারা প্রাথমিক তথ্য যাচাই করে ১ হাজার ৩৩৩টি কিশোর গ্যাং, ২১৩ জন দলনেতা বা সংগঠক এবং ২৭ পৃষ্ঠপোষকের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করেছেন।
পুলিশ সদরদপ্তরে তালিকা পাঠানোর আগে বর্তমানে বিভাগীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এসআরবি এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন গ্যাংয়ের ১৭৪ সদস্যকে আটক করেছে।
পুলিশ বলছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত না হলে শুধু সন্দেহভাজন হিসেবে গ্যাং সদস্যদের শনাক্ত বা আটক করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়াটা সহজ নয়।
অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান এবং এসআরবি মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব বলেন, সমস্যা হলো—সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ছাড়া সন্দেহভাজন গ্যাং সদস্য ও তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াটা বেশ কঠিন।
সমস্যা সমাধানে পুলিশকে অবশ্যই আইনের সীমার মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে বলে মনে করেন সায়েদুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি বিশেষ ক্ষমতা আইনে কিশোরদের গ্রেপ্তার করি, তবে তা ভালো চর্চা হবে না। আমরা কঠোর হতে পারি, কিন্তু নিষ্ঠুর হতে পারি না।
তিনি আরও যোগ করেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কেউ এই কিশোর গ্যাংগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হবে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীরা প্রায়ই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কিশোরদের ব্যবহার করে। তারা কিশোরদের অসহায়ত্ব এবং আইনের দুর্বলতার সুযোগ নেয়, কারণ কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে আইন কিছুটা নমনীয়।
তারা আরও বলেন, কিশোরদের খুব সহজেই প্রলুব্ধ করা যায় এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো সহজ হয়।
কিশোর গ্যাংগুলোর কোনো পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার নেই। বিভিন্ন পুলিশ ইউনিট আলাদাভাবে নিজেদের মতো করে তালিকা তৈরি করে, যার অধিকাংশই বেশ পুরোনো এবং বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিল নেই।
পুলিশ সদরদপ্তরের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩০৭টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৯৩টি, ঢাকা রেঞ্জে ৭৮টি ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৫৪টি গ্যাং রয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তালিকায় রয়েছে ৪১টি গ্যাং। এ ছাড়া খুলনা মহানগরে ১৩টি, রাজশাহী মহানগরে ১২টি, সিলেট মহানগরে ৫টি, বরিশাল মহানগরে ৩টি এবং খুলনা রেঞ্জে চারটি গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে।
তবে গাজীপুর মহানগর পুলিশ, রংপুর মহানগর পুলিশ, রাজশাহী রেঞ্জ বা বরিশাল রেঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো তালিকা নেই।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৪৮টি গ্যাংয়ের ২৭০ সদস্য ৬৯টি ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি মামলা (মোট মামলার ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ) গ্যাংগুলোর মধ্যকার সংঘাত সংক্রান্ত।
পুলিশের তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী, এই ৪৮টি গ্যাংয়ে মোট তালিকাভুক্ত সদস্য ৫৭৭ জন।
১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পুলিশ কঠোর অবস্থানে যায়। এর ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে কুমিল্লার ১৮টি থানা ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মিলে সমন্বিতভাবে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান শুরু করে।
এই হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়।
১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কুমিল্লাতেই ২ হাজার ৮১১ সন্দেহভাজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে অনেককে অবশ্য পরবর্তীতে তাদের পরিবারের মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই বিপুল সংখ্যক কিশোর আটকের ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে, সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িতদের আর কেবল ‘গ্যাং ম্যাপ’-এর ভিত্তিতে চিহ্নিত কিশোরদের মধ্যে পুলিশ কীভাবে পার্থক্য করছে।
গত ১৫ অক্টোবর মোহাম্মদপুরে ছয় মুখোশধারী দুর্বৃত্ত বাবা ও ছেলের ওপর হামলা চালায়। এতে ছেলে ছুরিকাঘাতে আহত হন। আর বাবা পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের ধারণা, ‘পাটালি’ ও ‘সাজ্জাদ’ নামে দুটি অপরাধী চক্রের পুরোনো শত্রুতার জেরে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব চক্র মূলত কিশোর গ্যাং, যারা মাদক কারবারি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। বয়সে বড় তরুণরা এসব গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা গেছে। মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় তাদের তৎপরতা রয়েছে এবং এলাকাটিতে গ্যাং-কেন্দ্রিক অপরাধ এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. উমর ফারুক মনে করেন, কেবল কিশোরদের গ্রেপ্তার বা আটক করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয়, যারা নিজেদের স্বার্থে এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এসব পৃষ্ঠপোষকদের ওপর দেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, ‘এসব কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে থাকা রাজনৈতিক মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনা গেলে কিশোর অপরাধ ও গ্যাং কালচার উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
অধ্যাপক উমর ফারুকের মতে, গ্যাংয়ের অনেক সদস্যই ছিন্নমূল, অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং মাদকাসক্ত। তাই যারা ইতোমধ্যে গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের ওপর নিয়মিত নজরদারি রাখা, সঠিক যত্ন নেওয়া এবং কাউন্সিলিং করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘এই সমস্যা মোকাবিলায় সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু পুলিশের পক্ষে এটি সমাধান করা সম্ভব নয়।



