পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ভীতিকর স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এলাকাবাসীকে।
পাড়েরহাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কাছেই মানিক পশারীর বাড়ি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তার ঘরটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি বাড়ি ছেড়ে গোপালগঞ্জে আশ্রয় নেন। এখন সেখানে খালি বসতভিটা পড়ে আছে।
গত শনিবার থেকেই ওই এলাকায় রাস্তা-চায়ের দোকানে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম।
তবে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রূপ নিতে শুরু করে। স্থানীয় চায়ের দোকানে কয়েকজন এ ব্যাপারে কথাও বলেন।
তাদের ভাষ্য, একজন মানুষের কবর খোঁড়ার পর মাটি ফেলে ভরাট করে দেওয়া, মামলা-হামলার হুমকি এবং পরবর্তীতে পুলিশের উপস্থিতিতে দাফন—এমন ঘটনা সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নবাসী আগে কখনো দেখেনি।
পাড়েরহাট এলাকার আকিদুলের চায়ের দোকান থেকে ২৫০ মিটারের মধ্যে মানিক পশারীর দুই বোনের বাড়ি। স্বজনদের কয়েকঘর রয়েছে একই পাড়ায়।
গ্রামবাসী ও স্বজনরা সাংবাদিকদের জানান, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন মানিক পশারী। তবে সেই মামলার সঙ্গে পরিবার ও স্বজনদের সম্পৃক্ততা ছিল না। এরপরও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মানিক পশারীর অনেক আত্মীয়কে বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে এবং তাদের কারাগারেও থাকতে হয়েছে।
তারা আরও জানান, জামায়াত নেতারা বলে থাকেন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও মানিক পশারীর ভাই চান্দু পশারীর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছিল।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তাদের এক আত্মীয়।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি বলেন, ‘সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দেওয়ায় প্রথম দিকে চান্দু কিছুটা প্রশাসনিক চাপে ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি পালিয়ে ঢাকায় চলে যান। পরে মানিক পশারীই তার ভাইকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন।
মানিক পশারীর ভগ্নীপতি চাঁন মিয়া পশারী বলেন, চিতলিয়া গ্রামে পশারী বংশের অন্তত ৩০০ মানুষ আছে। গ্রামের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আমাদের আত্মীয়। জানাজা-দাফনে তারা সবাই আসতেন।
‘কেউ মারা গেলে নিজেদের উদ্যোগে কবর খোঁড়া থেকে শুরু করে সব দায়িত্ব পালন করে গ্রামবাসী। কিন্তু এবার এখানে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ফলে কেউ আসেননি,’ বলেন তিনি।
‘গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র পরিবারের। প্রায় সবাই পেশায় জেলে। ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কায় কেউ এগিয়ে আসেনি,’ বলেন গ্রামের বাসিন্দা মোবারেক হাওলাদার।
তিনি আরও জানান, মানিক পশারী মারা যাওয়ার পর স্থানীয় পাঁচ-ছয়জন মিলে কবর খনন করেছিলেন। স্থানীয়রা জানাজার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন।
একই কথা জানান গ্রামের আরেক বাসিন্দা মুছা হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে স্থানীয়দের অনেক আগ্রহ ছিল। মূলত ভয়ে তারা সেখানে যাননি। সন্ধ্যার পর একদল লোক যখন কবর ভরাট করে দিলো, স্থানীয়রা তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন।
মোবারেক বলেন, ‘রাতে পুলিশের উপস্থিতিতে দাফনের পর আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। এ বিষয়ে কেউ তখন কথাও বলতে সাহস পায়নি।
জানতে চাইলে পিরোজপুর শহরের একটি মসজিদের ইমাম সিদ্দিকুল্লাহ বলেন, মৃত ব্যক্তির গোসল করানো, জানাজা পড়া ও দাফনের ব্যবস্থা করা জীবিতদের দায়িত্ব।
জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় অন্তত ১০ জন তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, তার ৫৫ বছরের জীবনে কখনো নারীদের কবর খনন করতে দেখেননি বা এমন ঘটনার কথা শোনেননি।
সিদ্দিকুর রহমান সিকদার নামে আরেকজন বলেন, গ্রামবাসীর উপস্থিতি ছাড়াই একজন মুসলমানের জানাজা ও দাফন হলো—এমন ঘটনা এই প্রথম।
গত ২৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মানিক পশারী মারা যান। গার্ড অব অনার প্রদানের জন্য স্বজনেরা দুপুরে মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন।
মরদেহ সেখানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা জড়ো হন এবং তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করেন।
পিরোজপুর পৌর জামায়াতের আমির আবদুর রাজ্জাক শেখের দাবি, ‘মানিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘মানিককে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং তার মরদেহ পিরোজপুরে দাফনে আমাদের আপত্তি রয়েছে।
পরে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
শনিবার সন্ধ্যায় একদল লোক খনন করা কবরে মাটি ফেলে ভরাট করে দেন।
মানিক পশারীর এক আত্মীয় পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সন্ধ্যার পর অন্তত ৩০ জন লোক কবরটি ভরাট করে ফেলেন। তার দাবি, তারা সবাই জামায়াতের নেতাকর্মী।
কবর ভরাটের সময় তিনি প্রতিবাদ করলেও ভয়ভীতি ও হুমকির কারণে সরে আসেন, জানান এই স্বজন।
চাঁন মিয়া জানান, কবর ভরাটের সময় মানিক পশারীর মেয়ে শিমু কান্নাকাটি করছিলেন। তারা শিমুকেও গালাগাল করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল রাতে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করেছি এবং প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছি, যাতে কোনো ধরনের অপীতিকর ঘটনা না ঘটে।
‘কিন্তু যারা সাঈদীকে ভালোবাসেন, তাদের আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। তারা ব্যক্তিগতভাবেই জড়ো হয়েছেন এবং যে যার মতো ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুকে এ নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন,’ যোগ করেন তিনি।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাত ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যদের পুনরায় কবর প্রস্তুত করতে বলা হয়। তবে ভয়ে সে সময় কেউ এগিয়ে আসেননি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যরা কবরটি পুনঃখনন শুরু করেন। পরে পুলিশ প্রশাসনের আশ্বাসে স্থানীয় কয়েকজন এসে কবরটি পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন করে দেন।
এরপর রোববার রাত ১টার দিকে পুলিশ মানিক পশারীর মরদেহ তার বাড়িতে নিয়ে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা পর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় পাঁচ মাস আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মানিক পশারীর একমাত্র ছেলে আছাদুল পশারীর মৃত্যু হয়। এর প্রায় দেড় বছর আগে তার মেয়ে পারুল আক্তার মারা যান। পারুলের স্বামী লাল মিয়া খলিফাও ৬-৭ মাস আগে মারা গেছেন। দুই সন্তান ও মেয়ে জামাইয়ের মৃত্যুর খবর পেলেও মানিক পশারী এলাকায় ফিরতে পারেননি।
তারা আরও জানান, মানিক পশারীর চাচা রইজউদ্দিন পশারী ও চাচাতো ভাই গনি পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
২০০৯ সালের ১১ আগস্ট পিরোজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করেন মানিক পশারী।
ওই মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি পুলিশি নিরাপত্তায় ছিলেন।
এদিকে মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে গতকাল দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে দলটি।
কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন—জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ও নূরুল ইসলাম বুলবুল।



