রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক কিশোর নিহতের ঘটনায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে পরিবার।
নিহতের পরিবারের দাবি, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে সাদা পোশাকে এসআরবি সদস্যদের ছোঁড়া গুলিতে ওই কিশোরের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার পরদিন যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত মারুফ হোসেন ওরফে দুখুর (১৮) মা সেলিনা বেগম।
যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকায় ওই অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে এসআরবি সদস্যরা হামলার শিকার হন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে।
২৮ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) আকতার হোসেন জানান, ধলপুরে সেদিন এসআরবি সদস্য ও মাদক চোরাকারবারিদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে এক কিশোর আহত হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তবে নিহতের বড় বোন রোকসানা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেদিন সাদা পোশাকধারী ১০-১২ এসআরবি সদস্য স্থানীয় কয়েকজনকে আটক করে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা নেয়।
সাদা পোশাকধারীরা যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য তা বুঝতে না পারায় আটককৃতরা তাদের মারধর করেন বলে জানান তিনি।
‘এরপর এসআরবি সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। আটক লোকজন তখন বিভিন্ন দিকে দৌড়াতে থাকে। গুলির শব্দ শুনে আমার ছোট ভাই কী হচ্ছে দেখতে বের হয়। তখন তার গায়ে গুলি লাগে,’ বলেন রোকসানা।
তার দাবি, ঘটনার সময় স্থানীয় কারও কাছে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না এবং স্থানীয়রা গুলি চালায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক সদস্য তার এই বক্তব্যের একাংশ সমর্থন করে সাংবাদিকদের জানান, অভিযানের সময় শুধু এসআরবি সদস্যরাই গুলি চালিয়েছিলেন।
তিনি আরও জানান, ধলপুরে মাদক সংক্রান্ত অপরাধ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করায় এসআরবি সদস্যরা সাদা পোশাকে অভিযান চালাতে যান। বাধার মুখে পড়লে পরিস্থিতি সামলাতে তারা ৫ রাউন্ড গুলি চালান।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে কাজ শেষে বাসায় ফেরে মারুফ। পরে অন্যান্য দিনের মতো সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ক্রিকেট খেলতে বাসা থেকে বের হয়।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে আউটফল স্টাফ কোয়ার্টার ১৪ নম্বর সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত চারতলা ভবনের কাছে পৌঁছালে অজ্ঞাত হামলাকারীরা গুলি করে। সেখান থেকে পালানোর সময় মারুফের ডান কাঁধে গুলি লাগে।
স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, মারুফের মা পরে স্থানীয়দের কাছে জানতে পারেন অজ্ঞাত মাদক চোরাকারবারিরা এসআরবি সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে এসআরবি সদস্যরাও ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
কিন্তু নিহতের বোন রোকসানা এজাহারের বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী তার মা ওই কাগজে সই করেছিলেন।
‘আমার মা এগুলোর কিছুই বোঝেননি,’ বলেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
এদিকে, গুলি চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এসআরবি-১০ এর অধিনায়ক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মাদক কারবারিরা এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে আটক ৪ জনকে ছিনিয়ে নেয়। পরে তারা এসআরবি সদস্যদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।
এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী যাত্রাবাড়ী থানায় মামলার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘তদন্তে আমাদের কোনো সদস্যের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোরের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। গতকাল এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, এসআরবির দেওয়া তথ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, এসআরবি সদস্য পরিচয় দিয়ে ৩ জনকে হাতকড়া পরানোর সময় ইট-পাটকেল ছোঁড়া হয়। এরপর দুই এসআরবি সদস্য গুলি চালান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
ওই কিশোরের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত ও তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আনার আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএসএস।
একইসঙ্গে ব্যালিস্টিক প্রমাণ, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড এবং অভিযান সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ ও পরীক্ষার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি, নিহতের পরিবার ও সাক্ষীদের সুরক্ষা, দায়ীদের বিচার করা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।



