দেশে চোখের স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে আগামী পাঁচ বছরে ১২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। এ অর্থে প্রায় ২ কোটি মানুষকে প্রাথমিক চক্ষুসেবা, ১০ লাখ বিনামূল্যে ছানি অস্ত্রোপচার এবং সারা দেশে ১ কোটি চশমা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো আয়োজিত বৈশ্বিক চোখের স্বাস্থ্য সম্মেলন বা গ্লোবাল সামিট ফর আই হেলথে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা সরকারের আয়োজনে এবং বাংলাদেশ, গায়ানা, আয়ারল্যান্ড ও নাইজেরিয়া সরকারের সহ-আয়োজনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সম্মেলনটি আয়োজনের উদ্যোগ নেয় ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেস (আইএপিবি)।
সম্মেলনে ঘোষিত বাংলাদেশের এ অঙ্গীকার বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধযোগ্য দৃষ্টিশক্তি হারানোর সমস্যা দূর করতে নেওয়া বৃহত্তর কর্মপরিকল্পনার অংশ। এতে বিভিন্ন দেশের সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও বেসরকারি খাতের অংশীদাররা নিজেদের অঙ্গীকার তুলে ধরেন।
বাংলাদেশে প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য দৃষ্টিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা অনেক। তাই চক্ষুসেবার পরিধি বাড়ানো জরুরি। ছানি অস্ত্রোপচার, চশমা বিতরণ ও কমিউনিটিভিত্তিক চক্ষুসেবার সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে আরও লাখো মানুষকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশে সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চোখের স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের বড় সুযোগ রয়েছে। আইএপিবির ভিশন অ্যাটলাসে প্রকাশিত ‘ভ্যালু অব ভিশন: দ্য কেস ফর ইনভেস্টিং ইন আই হেলথ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চোখের স্বাস্থ্যখাতে প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ (১২৯ মিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগ করা হলে আনুমানিক ২৩১ কোটি (২.৩১ বিলিয়ন) ডলারের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব।
এ বিনিয়োগের ফলে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার মান ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, ‘প্রতিটি নাগরিকের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিয়ে স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি নিশ্চিত করা আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা অন্ধত্ব, দৃষ্টিজনিত প্রতিবন্ধকতা এবং এ-সংক্রান্ত রোগের প্রচার, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চাই। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য চক্ষুসেবা পৌঁছে দিতে আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করব।
বাংলাদেশে চক্ষুসেবার সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভিশনস্প্রিং অন্যতম। বিশেষ করে সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠানটি কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিশা মাহজাবিন বলেন, ‘চশমা কোনো বিলাসদ্রব্য নয়। এটি মানুষের জীবিকা, স্বনির্ভরতা এবং সার্বিক সুস্থতা উন্নয়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভিশনস্প্রিং কমিউনিটিভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে চশমা পৌঁছে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই কার্যক্রমের পাশাপাশি তৈরি পোশাক কারখানা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এবং পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্ব আরও সম্প্রসারণ করা হবে, যাতে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও পরিবহনখাতের কর্মীদের কাছে চক্ষুসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।
সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও স্বাস্থ্যখাতের নেতৃস্থানীয়রা অংশ নেন। বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধযোগ্য দৃষ্টিশক্তি হারানোর সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ ত্বরান্বিত করাই ছিল সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে গ্লুকোমায় আক্রান্ত হওয়ার হার ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, টিএইচআরআইভিই গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পেশায় কাছের জিনিস দেখার প্রয়োজন হয়, সেসব পেশার কর্মীদের চশমা সরবরাহের ফলে তাদের মধ্যম মাসিক আয় ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
গবেষণার এসব ফলাফল সবার জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চক্ষুসেবা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। পাশাপাশি নারী ও মেয়েশিশুরা যাতে প্রয়োজনীয় চক্ষুসেবা পায় এবং উন্নত দৃষ্টিশক্তির সুফল সমানভাবে ভোগ করতে পারে, সে জন্য লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইএপিবির প্রধান নির্বাহী পিটার হল্যান্ড বলেন, ‘গ্লোবাল সামিট ফর আই হেলথ বিশ্বব্যাপী চক্ষুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় সেবার সুযোগ সম্প্রসারণের অভিন্ন অঙ্গীকার নিয়ে এর আগে এত বিপুলসংখ্যক সরকার, প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারিখাতের নেতৃস্থানীয়রা কখনো একত্রিত হননি।
তিনি বলেন, ‘এই সপ্তাহে ঘোষিত বিভিন্ন অঙ্গীকারের সমন্বিত উদ্যোগ শত শত কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এর ফলে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন, কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় থাকতে পারবেন, পরিবারের যত্ন নিতে পারবেন এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এটি প্রমাণ করে যে, চোখের স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগকে এখন মানবিক সম্ভাবনার বিকাশ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগ হিসেবে ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
আইএপিবি বা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেস বিশ্বব্যাপী চক্ষুস্বাস্থ্যখাতের একটি আন্তর্জাতিক জোট। বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে ৩০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এ জোটের সঙ্গে কাজ করছে। সর্বজনীন চক্ষুসেবার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং কোনো মানুষকে অপ্রয়োজনে দৃষ্টিশক্তি হারাতে না দেওয়াই সংস্থাটির লক্ষ্য। দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্তরাও যাতে নিজেদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতেও কাজ করে সংস্থাটি।






