একসময় বার্সেলোনার জার্সিতে খেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা হুলিয়ান আলভারেজ। সেই ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে আসার পর নিজের ক্লাব আতলেতিকো মাদ্রিদের সমর্থকদের বিরাগভাজন হন তিনি। দল ছাড়ার চেষ্টা করেও সফল হননি এই ফরোয়ার্ড। শেষ পর্যন্ত মাদ্রিদেই থেকে যেতে হয়েছে তাকে।
এবার সেই বার্সেলোনার বিপক্ষেই মাঠে নামার অপেক্ষায় আলভারেজ। মেত্রোপলিতানোতে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে জয় পেলে লা লিগার শীর্ষস্থানও দখল করতে পারে আতলেতিকো। তাই সমর্থকদের হারানো আস্থা ফিরে পাওয়ার বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন আর্জেন্টাইন তারকা।
গত মৌসুমে কোপা দেল রে ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে বার্সেলোনাকে বিদায় করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আলভারেজের। দুই প্রতিযোগিতাতেই কাতালান ক্লাবটির বিপক্ষে গোল করেছিলেন তিনি। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে বার্সেলোনায় খেলার আগ্রহ প্রকাশ করায় পরিস্থিতি বদলে যায়।
বিশ্বকাপ চলাকালে আর্জেন্টিনা আলজেরিয়াকে হারানোর পর সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন আলভারেজ। তিনি সরাসরি বার্সেলোনার নাম উল্লেখ না করলেও দলবদলের সম্ভাবনার কথা অস্বীকার করেননি। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সবার জন্য ভালো হয় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
তার এই মন্তব্য আতলেতিকো সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। অন্যদিকে বার্সেলোনাও তাকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। তবে আতলেতিকো কর্তৃপক্ষ আলভারেজকে ছাড়তে রাজি হয়নি। ফলে নতুন মৌসুমেও মাদ্রিদে থেকে যেতে হয় তাকে।
এরপর থেকেই সমর্থকদের দুয়ো শুনতে শুরু করেন এই ফরোয়ার্ড। একপর্যায়ে সতীর্থরা যখন দর্শকদের অভিবাদন জানাচ্ছিলেন, তখন আলভারেজকে একা টানেলের দিকে চলে যেতে বলা হয়। গ্যালারি থেকে তাকে ক্লাব ছাড়ার দাবিও ওঠে। দলবদলের বাজার শেষ হওয়ার মাত্র ছয় দিন আগেও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এর মধ্যে দুই দিন অনুশীলনেও অনুপস্থিত ছিলেন তিনি।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পরে নিজের এজেন্ট ফার্নান্দো ইদালগোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন আলভারেজ। আতলেতিকোর প্রধান নির্বাহী আগে অভিযোগ করেছিলেন, এজেন্ট তাকে ভুল পথে পরিচালিত করছেন। অন্যদিকে ইদালগো ক্লাবের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ তুলেছিলেন। এজেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে দলে বেশি সময় পেতে শুরু করেন আলভারেজ।
তবে শুরুতে মাঠের পারফরম্যান্সে প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যায়নি। অবশেষে ২০ অক্টোবর স্টুটগার্টের বিপক্ষে গোল করে দীর্ঘ খরা কাটান তিনি। এরপর চার দিন পর দেপোর্তিভো লা করুনিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়েও গোল করেন এই আর্জেন্টাইন।
সেই ম্যাচের পর সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চান আলভারেজ। বিশ্বকাপের সময় নিজের মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি জানান, সমর্থকদের অসন্তোষের কারণ বুঝতে পারছেন। তার মতে, সমর্থকেরা যেভাবে তাকে সমর্থন দিয়েছেন, তাতে তাদের রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক।
তবে ক্লাব ছাড়ার ইচ্ছা পুরোপুরি বদলে গেছে, এমন কোনো ঘোষণা দেননি আলভারেজ। বরং নিজের বক্তব্য প্রকাশের সময় ও ধরন নিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন তিনি।
আলভারেজের ক্ষমা চাওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন আতলেতিকোর কোচ দিয়েগো সিমিওনে। তার মতে, ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার জন্য সাহস প্রয়োজন। এই ঘটনার পর আলভারেজ মানসিকভাবে আগের চেয়ে স্বস্তিতে রয়েছেন বলেও মনে করেন তিনি।
তবে সমর্থকদের সবাই এখনো তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেননি। অনেকের মতে, ঘটনার পরপরই ক্ষমা চাইতে পারতেন তিনি। প্রায় চার মাস পর এবং আতলেতিকোতেই থাকা নিশ্চিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর তার ক্ষমা চাওয়ায় কেউ কেউ ভিন্ন অর্থও খুঁজছেন।
অন্যদিকে আলভারেজের সামর্থ্য নিয়ে সতীর্থদের যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। গোলরক্ষক ইয়ান ওবলাক মনে করেন, দলের সাফল্যের জন্য আলভারেজের কাছ থেকে আরও বেশি গোল প্রয়োজন। আলেক্স গ্রিমালদোর বিশ্বাস, এই আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের মধ্যে অসংখ্য গোল করার সক্ষমতা রয়েছে।
মৌসুমের শুরুতে প্রথম সাত ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন আলভারেজ। তখন গোলের দেখাও পাননি। তবে পরবর্তী আট ম্যাচের পাঁচটিতে প্রথম একাদশে জায়গা পেয়ে দুটি গোল করেছেন তিনি। ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ ফিরে পাচ্ছেন এই আর্জেন্টাইন।
এদিকে আলভারেজকে দলে পাওয়ার চেষ্টা করা বার্সেলোনা এখন অন্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা করেই এগোচ্ছে। গ্রীষ্মকালীন দলবদলে রবার্ট লেভানডভস্কি, মার্কাস রাশফোর্ড ও ফেররান তোরেসকে হারানোর পর কোচ আক্রমণভাগে রাফিনিয়াকে নতুন ভূমিকায় ব্যবহার করছেন। স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেই দারুণ সফল হয়েছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। ইতোমধ্যে ১৯ গোল করে ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনেও রয়েছেন তিনি।
বার্সেলোনার হয়ে লামিন ইয়ামালও দুর্দান্ত ফর্মে আছেন। তার গোলসংখ্যা ১৩, সঙ্গে রয়েছে ১১টি অ্যাসিস্ট। দলের মোট ১৩ জন আলাদা খেলোয়াড় গোল করেছেন। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে আক্রমণভাগে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে কাতালানরা।
অন্যদিকে লা লিগায় দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে আতলেতিকোও। বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হারলেও স্প্যানিশ লিগে টানা সাত ম্যাচে জয় পেয়েছে সিমিওনের দল। এই ধারায় নগর প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকেও হারিয়েছে তারা। গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় এবার দলের পয়েন্টসংখ্যাও বেশি।
আতলেতিকোর হয়ে গোল করার দায়িত্বও ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন একাধিক ফুটবলার। লিগে আলভারেজের গোল একটি হলেও আলেক্স বায়েনা করেছেন পাঁচটি, আলেক্স গ্রিমালদো চারটি এবং জোনাথন ডেভিড ও জুলিয়ানো সিমিওনে করেছেন তিনটি করে গোল।
১১ ম্যাচ শেষে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে লা লিগার শীর্ষে রয়েছে বার্সেলোনা। ২৮ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আতলেতিকো এবং ২৭ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রিয়াল মাদ্রিদ। বার্সেলোনাকে হারাতে পারলে ৩১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান দখল করবে আতলেতিকো।
আলভারেজের ওপর দলের গোলের নির্ভরতা কিছুটা কমলেও তার সেরা পারফরম্যান্স ফিরে পাওয়া আতলেতিকোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোচ সিমিওনের বিশ্বাস, ক্লাবের বড় লক্ষ্য অর্জনে এই ফরোয়ার্ডের অবদান প্রয়োজন।
সিমিওনের ভাষায়, ক্লাব যদি সমর্থকদের স্বপ্ন পূরণের অবস্থানে থাকতে চায়, তাহলে দলে হুলিয়ান আলভারেজের মতো খেলোয়াড়কে প্রয়োজন। তাই বার্সেলোনার বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচটি শুধু পয়েন্টের লড়াই নয়, আলভারেজের জন্য নিজের সামর্থ্য প্রমাণ এবং সমর্থকদের বিশ্বাস পুনরুদ্ধারেরও বড় মঞ্চ।






