ভারত কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া তুরস্কের সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থে সম্পর্ক ধরে রাখতে চাইছে। মাদক পাচন দমন, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করতে আগ্রহী নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জম্মু‑কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বাইরের কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই, তারপরও তারা আঙ্কারার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
কাশ্মির ইস্যুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান বারবার পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। ২০১৯ সালে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর তিনি সরব হন এবং ২০২০, ২০২১ ও সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কাশ্মির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার সব বিরোধ জাতিসংঘ সনদের কাঠামোর মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে মীমাংসা হওয়া উচিত। এর জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, জম্মু‑কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বাইরের কোনো পক্ষের ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক মতবিরোধের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার কিছু ক্ষেত্র রয়েছে। সম্প্রতি তুরস্ক থেকে মাদক পাচারকারী নাভপ্রীত সিংকে ভারতে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে, যা ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ বলেছেন। তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিনচি এপ্রিলে চার বছর পর দুই দেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের আলোচনায় অংশ নেন এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, জ্বালানি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা নিয়ে আলোচনা করেন। তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মাদক পাচন দমন তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা কাশ্মির ইস্যু। তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলে ভারতের সামনে কয়েকটি কৌশলগত সুযোগ থাকে। প্রথমত, এর মাধ্যমে ইসলামী বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পায় নয়াদিল্লি। দ্বিতীয়ত, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তায় সহযোগিতা দুই দেশের জন্য লাভজনক হতে পারে বলে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুক্তেশ পারদেশি মতামত দেন।
তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের উদ্বেগও কমে না। গত ৭ আগস্ট তুরস্ক সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিয়েছে, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে তুরস্কের উন্নত ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি পাকিস্তানের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত ও সামরিক‑শিল্প সহযোগিতা পর্যালোচনা করছেন, বিশেষ করে উন্নত ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার বিষয়ে নজর রাখছেন। এ চুক্তির কারণে ভবিষ্যতে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক অভিযান নিয়েও তুরস্ক বা সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারত জানিয়েছে, তিন দেশের এই সমঝোতার ওপর নজর রাখছে তারা। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত নয়াদিল্লি। এদিকে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন কৌশলগত সমীকরণের মধ্যে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের সহযোগিতা একটি পাল্টা ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আঙ্কারার সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটছে না নয়াদিল্লি। কাশ্মির ও প্রতিরক্ষা নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্কের কার্যকর ক্ষেত্রগুলো ধরে রাখতে চাইছে ভারত।



