পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাদারীপুরের তরুণ নির্মাণশ্রমিক সাব্বির হোসেন ২৫ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে ছুটি পান, কারণ তার মানসিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। তবে বাড়ি ফেরার মাত্র একদিন পরেই পরিবারের সহায়তায় তাকে আবারও পুরোনো ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সাব্বির নিজে বলছেন, ‘আমি সুস্থ, শুধু বাড়ি ফিরে যেতে চাই,’ যদিও তার পরিবার বাবার ওপর হামলার ভয়ে তাকে নিতে চায় না।
সাব্বিরের এই পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পটুয়াখালীর মো. তরুণ মিয়াও ২৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে ঠিক পরের দিনই স্বজনদের মাধ্যমে আবার পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালের ১ নম্বর ওয়ার্ডের স্টাফ নার্স রাজিয়া বেগম সাংবাদিকদের জানান, রোগীরা যখন অবস্থার উন্নতি হয়ে ছুটি নেন, তখন তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে অনেক পরিবারই আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় না, ফলে তারা বহির্বিভাগের মাধ্যমে আগের চিকিৎসার তথ্য লুকিয়ে নতুন রোগী হিসেবে ভর্তি হন।
রাজিয়া আরও বলেন, তার ওয়ার্ডের ২৫ জন রোগীর মধ্যে ৩ জন সম্প্রতি একই পরিস্থিতির শিকার হয়ে নতুন করে ভর্তি হতে হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় সব ওয়ার্ডেই প্রতিনিয়ত এটি ঘটছে। পাবনা মানসিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. এহিয়া কামাল জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আবাসিক রোগীদের ৩০ শতাংশের বেশি পুনর্ভর্তি হওয়া পুরোনো রোগী। তিনি বলেন, ‘৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটি দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্র। কিন্তু বারবার একই রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমরা নতুন রোগীদের সেবা দেওয়া থেকে বঞ্চিত করছি।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বহির্বিভাগে ৩৫ হাজার ৩৭০ রোগী সেবা নিয়েছেন। একইসময়ে ২ হাজার ৭২৩ জন ভর্তি হন এবং ২ হাজার ৭০৭ জন ছুটি পান। তত্ত্বাবধায়ক এহিয়া কামাল জানান, নিয়মিত পুনর্ভর্তির কারণে নতুন রোগীদের জন্য শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘তবে বেশিরভাগ রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না। ফলে নিয়ম মেনে চিকিৎসা না নেওয়ায় আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে অনেক রোগী।
হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আব্দুল বারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বেশিরভাগ রোগীর পরিবার চায় তাদের স্বজনরা পরিপূর্ণ সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরুক।’ চিকিৎসকদের মতে, শুধু হাসপাতালের সেবা দিয়ে মানসিক রোগীর চিকিৎসা পরিপূর্ণ করা সম্ভব নয়। তারা পরিবার ও সমাজকে সমানভাবে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেন।
হাসপাতাল চত্বরে দেখা হয় পাবনার তিলকপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী এক মানসিক রোগীর সঙ্গে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা তার মেয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার বাবা আগে ব্যবসা করতেন। একটি দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকে পরিবারের সবাই তাকে অবহেলা করা শুরু করে। ফলে বাধ্য হয়ে মেয়েই বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন।
এদিকে দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল হলেও, পাবনা মানসিক হাসপাতালে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। ৬৫০টি অনুমোদিত পদের ১৬১টিই বর্তমানে খালি, যার মধ্যে ১২টি চিকিৎসক পদ। বর্তমানে মাত্র ১৯ জন চিকিৎসক এবং প্রায় ৪৩৭ জন কর্মী নিয়ে হাসপাতালটি চলছে। ৪০০ জনের বেশি আবাসিক রোগী ও প্রতিদিন ১১০০-১২০০ রোগীকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডা. এহিয়া কামাল বলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে হাসপাতালের উন্নয়নে একটি মেগাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা, শয্যা সংখ্যাসহ সেবার পরিসর আরও বৃদ্ধি পাবে আশা করি।



