দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেমের কাছ থেকে ৯৭২ কোটি টাকায় কেনা ৩০টি লোকোমোটিভের মধ্যে ১৮টিই চার বছরের মধ্যে অচল হয়ে পড়েছে। অথচ ইঞ্জিনগুলো ২০ বছর চলার কথা ছিল।
এসব লোকোমোটিভ সচল রাখা এবং আরও ৪০টির রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিন বছরের জন্য ৬৮০ কোটি টাকার চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ইঞ্জিনের অভাবে পূর্বাঞ্চলে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল কমে গেছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আটটি কনটেইনার ট্রেনের মধ্যে নিয়মিত চলছে মাত্র দুটি। এছাড়া এই অঞ্চলের ঢাকা-নোয়াখালীসহ বিভিন্ন রুটে পাঁচটি যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে।
রেলওয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, চুক্তিটি হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান প্রগ্রেস রেল পূর্বাঞ্চলের ৩০টি কোরীয় ইঞ্জিন এবং পশ্চিমাঞ্চলের আরও ৪০টি ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও কারিগরি সহায়তাও পাওয়া যাবে।
তবে এই চুক্তি করতে অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন।
রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, লোকোমোটিভ কেনার সময় রেলওয়ের ক্রয় বিভাগ কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করেনি। এখন ইঞ্জিনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করতে রেলওয়ে একটি চুক্তি করতে চাচ্ছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, হুন্দাই রোটেমের ইঞ্জিনগুলো ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চলাচল শুরু করে। এগুলোর প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল ২০ বছর। কিন্তু ২০২৩ সালে একটি ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়ে। পরের বছর অচল হয় আরও চারটি। ২০২৫ সালে অচল ইঞ্জিনের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টিতে। চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে ১৮টিতে পৌঁছায়।
রেলওয়ের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাব এবং হুন্দাই রোটেমের কারিগরি সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইঞ্জিনগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির কারিগরি সহায়তা শেষ হয়। এরপর থেকে নিজস্ব ওয়ার্কশপ ও কর্মীদের দিয়ে ইঞ্জিনগুলো সচল রাখার চেষ্টা করছে রেলওয়ে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন ১১৯টি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬৫টি।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা শফিকুর রহমান ডেইল স্টারকে বলেন, ১৮টি ইঞ্জিন অচল থাকায় শিডিউল অনুযায়ী কনটেইনার ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। হাতে থাকা ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। এতে রেলওয়ের সবচেয়ে লাভজনক খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আটটি কনটেইনার ট্রেনের মধ্যে এখন নিয়মিত চলছে মাত্র দুটি।
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৮৭৮টি কনটেইনার ট্রিপ পরিচালিত হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৬৭টিতে। একই সময়ে কনটেইনার পরিবহন থেকে আয় ২৯৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা থেকে কমে ১৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকায় নেমে আসে।
কনটেইনার ট্রেন চালাতে প্রতিদিন গড়ে যতটি ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হতো, তা-ও কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিদিন গড়ে ১১টি ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আটটিতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছয়টিতে এবং সর্বশেষ অর্থবছরে মাত্র তিনটিতে নেমে আসে।
ইঞ্জিন সংকটে যাত্রী পরিবহনেও প্রভাব পড়েছে।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম-টাঙ্গাইল, ঢাকা-নোয়াখালী ও লাকসাম-নোয়াখালী রুটে পাঁচটি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম ও লাকসাম জংশন স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ যাত্রী যাতায়াত করতেন।
এদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস গত জুলাই থেকে অধিকাংশ যাত্রায় দেরিতে চলছে। ইঞ্জিন সময়মতো না পাওয়ায় ট্রেনটির যাত্রা ১৫ মিনিট থেকে আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত পিছিয়েছে।
রেলওয়ের পরিচালক (লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ) সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, এসব ইঞ্জিন মেরামত করতে কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট সফটওয়্যার প্রয়োজন। এছাড়া কিছু যন্ত্রাংশ শুধু নির্দিষ্ট প্রস্তুতকারকের কাছ থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। রেলওয়ের বর্তমান ব্যবস্থায় এসব চাহিদা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে ডিজেল ওয়ার্কশপের যান্ত্রিক প্রকৌশলী ও ওয়ার্কস ম্যানেজার এহতেশাম মো. শফিক সাংবাদিকদের বলেন, ইঞ্জিনগুলোর সেন্সরে বিকল্প যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা যায় না। ফলে প্রস্তুতকারক বা অনুমোদিত সরবরাহকারীর সহায়তা ছাড়া সেগুলো মেরামত করা কঠিন।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবরে হুন্দাই রোটেমের দেওয়া ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পাঁচটি ইঞ্জিনে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। কোম্পানির কারিগরি দল সেগুলো মেরামত করলেও পরে আবার সমস্যা দেখা দেয়। ওই দল বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পর রেলওয়ের কর্মীরা ইঞ্জিনগুলো সচল রাখতে পারেননি।
শফিক বলেন, রেলওয়ে বিষয়টি হুন্দাই রোটেমকে জানালে কোম্পানিটি জানায়, ইঞ্জিনগুলোতে নির্ধারিত সময় পরপর রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। এ কাজ ওয়ারেন্টির আওতায় ছিল না, রেলওয়েকেই আলাদাভাবে এর ব্যবস্থা করতে হতো।
এ বিষয়ে হুন্দাই রোটেমের বক্তব্য জানতে গত ৫ অক্টোবর ই-মেইল করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোম্পানিটি জবাব দেয়নি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. শামসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ইঞ্জিন কেনার আগে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও কারিগরি সহায়তার খরচ বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, ইঞ্জিনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করায় ক্রয় পরিকল্পনা ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।
হুন্দাই রোটেম থেকে দুই দফায় ৩০টি ইঞ্জিন কেনে রেলওয়ে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২০১৮ সালে ২৯৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় ১০টি এবং ২০১৯ সালের চুক্তিতে ৬৭৪ কোটি ৯ লাখ টাকায় আরও ২০টি ইঞ্জিন কেনা হয়।
প্রথম দফায় কেনা ১০টি ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তের সঙ্গে সরবরাহ করা কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের অমিল পায় রেলওয়ের তদন্ত কমিটি। এসব যন্ত্রাংশের মধ্যে কম্প্রেসর ও ট্র্যাকশন মোটরও ছিল।
টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে আসে। ২০২৫ সালে ইঞ্জিন কেনা ও গ্রহণে অনিয়মের অভিযোগে রেলওয়ের তিন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ওই ১০টি ইঞ্জিনের ছয়টি বর্তমানে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ওয়ার্কশপে অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
রেলওয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামাভিত্তিক প্রগ্রেস রেল তিন বছর ধরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণসেবা দেবে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি দেশ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে এই সেবা সরবরাহ করা হবে। হুন্দাই রোটেমের ইঞ্জিনে ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রাংশের প্রযুক্তি ও স্বত্ব প্রগ্রেস রেলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
প্রস্তাবে কর্মীদের বেতন, পরামর্শক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খরচের জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। বাকি প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার বেশির ভাগ ব্যয় হবে তিন বছরে যন্ত্রাংশ কেনার জন্য।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের আশা, চুক্তি কার্যকর হলে ৭০টি ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা প্রায় ৯৫ শতাংশে উন্নীত হবে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, প্রস্তাবটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। তবে অর্থ বিভাগসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার অনুমোদন এখনো বাকি। কয়েকটি সংস্থা কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। সেগুলোর জবাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। এরপর প্রস্তাবটি আবার অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হবে।



