বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
১৪ই কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

বাংলাদেশিদের চাকরির আশ্বাসে নিয়ে জোর করে যুদ্ধে পাঠাচ্ছে রাশিয়া: জাতিসংঘ প্রতিবেদন

বাংলাদেশিদের চাকরির আশ্বাসে নিয়ে জোর করে যুদ্ধে পাঠাচ্ছে রাশিয়া: জাতিসংঘ প্রতিবেদন...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৯ পিএমসর্বশেষ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম
বাংলাদেশিদের চাকরির আশ্বাসে নিয়ে জোর করে যুদ্ধে পাঠাচ্ছে রাশিয়া: জাতিসংঘ প্রতিবেদন

উচ্চবেতনে চাকরির প্রলোভন দিয়ে রাশিয়া নিয়ে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং পরে তাদের ইউক্রেনের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে বলে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রলোভন কিংবা জোর করে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ২৯ দেশের নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও আছেন।

তাদের মধ্যে অনেকেই নিহত হয়েছেন কিংবা নিখোঁজ রয়েছেন। অনেকক্ষেত্রে তাদের পরিবারগুলো জানছে না তাদের ভাগ্যে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে।

'ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব ইনকোয়ারি অন ইউক্রেন' বাংলাদেশি নাগরিকদের দেওয়া ভিসার অনুলিপিও সংগ্রহ করেছে। সেখানে দেখা যায়, রাশিয়ার একটি বেসামরিক কোম্পানির মাধ্যমে তাদের সেখানে নেওয়া হয়।

গতকাল সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এর আগে থেকেই রাশিয়ায় চাকরির আশায় যাওয়া বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ উদ্বেগ তৈরি হয়। তাদের জোর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে তাদের অনেকে নিহত হন বা বন্দি হন বলে খবর পাওয়া গেছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য রাশিয়া ৭ হাজার ৯৪৯টি চাকরির ছাড়পত্র জারি করেছে।

চলতি বছরের মার্চে 'ফরটিফাই রাইটস' এবং 'ট্রুথ হাউন্ড'-এর যৌথ তদন্তে জানা যায়, অন্তত ১০৪ বাংলাদেশি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

বেশ কয়েকটি পরিবার এখনো রাশিয়ায় গিয়ে মৃত সন্তান বা স্বজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হতে কিংবা মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছে।

যদিও জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এ প্রতিবেদনে ঠিক কত বাংলাদেশি পাচার, নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

জাতিসংঘ কমিশন ৪৮ দেশের নাগরিকদের রাশিয়ায় নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় তদন্ত করেছে। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, কেনিয়া, নাইজেরিয়া ও উজবেকিস্তানসহ ২৯ দেশের ক্ষেত্রে প্রতারণামূলক বা জোরপূর্বক নিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে কমিশন।

চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তি, তাদের পরিবার ও অন্যান্য উৎস থেকে ২৪৫টি সাক্ষ্যপ্রমাণের পাশাপাশি চাকরির আমন্ত্রণপত্র, ভিসা, ভ্রমণের তথ্য এবং রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তিসহ বিভিন্ন নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

কমিশন মনে করছে, রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশে সক্রিয় রিক্রুটিং এজেন্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে মানবপাচার এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ সংঘটিত করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিক্রুটিং এজেন্টরা রাশিয়ায় নিরাপত্তা রক্ষী, ড্রাইভার, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, নির্মাণ শ্রমিক ও টেকনিশিয়ান হিসেবে লোভ বেসামরিক চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে।

কেউ আবার রুশ নাগরিকত্ব, বিলাবহুল জীবনযাপন, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস দিয়েছিল। এসব প্রলোভনকে বিশ্বাস করে দরিদ্র শ্রেণির পরিবারগুলো তা লুফে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

এজেন্টরা তাদের ভিসা, ফ্লাইটের টিকিট ও থাকার ব্যবস্থা করত এবং ক্ষেত্রবিশেষে যাত্রাপথে তাদের সঙ্গী হতো বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের সাময়িক আবাসন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হতো এবং পরে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অনেককে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক বছরের চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়েছে।

চুক্তিগুলো ছিল শুধু রুশ ভাষায় লেখা, যা অধিকাংশ বিদেশির পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না।

তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হতো, যেন যোগাযোগ বা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকে। কেউ চুক্তিতে সই করতে রাজি না হলে তাকে নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হতো।

যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর আগে তাদের সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। মাত্র ২০ মিনিট থেকে শুরু করে কয়েক দিন বা সর্বোচ্চ এক মাস পর্যন্ত চলত এই প্রশিক্ষণপর্ব।

ইউক্রেনে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের দেওয়া হতো ঝুঁকিপূর্ণ সব কাজ। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধে পাঠানোর অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকেই নিহত, আহত বা নিখোঁজ হন।

কমিশনের নথিভুক্ত একটি ঘটনায় দেখা যায়, ৩০ জনের একটি দলকে একটি বেসামরিক কোম্পানি লিখিতভাবে আশ্বাস দিয়েছিল যে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হবে না। অথচ পরে তাদের ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন, ৫ জন নিখোঁজ হন এবং একজন আহত অবস্থায় ফিরে আসেন।

তবে, কমিশন ওই ৩০ জনের জাতীয়তা উল্লেখ করেনি প্রতিবেদনে।

তদন্তকারীরা আরও দেখেছেন যে, রিক্রুটমেন্ট এজেন্ট এবং সামরিক সদস্যরা অনেক সময় নিয়োগকৃতদের বেতন-বোনাস আত্মসাৎ করত, যার ফলে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।

চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়া নিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠয়ে সামরিক কাজে যোগ দিতে বাধ্য করার বিষয়েসংবাদমাধ্যম এর আগে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

গত বছরের এপ্রিলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানবপাচার সেল দেখতে পায়, ঢাকার 'ড্রিম হোম ট্রাভেল' বেসামরিক কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাসে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতনের লোভ দেখিয়ে প্রায় ২০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়া পাচার করেছিল।

পরে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়ে অন্তত ৩ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

গত ১৪ অক্টোবর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, নির্মাণকাজের কথা বলে রাশিয়া পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন মারা যান এবং পরে আরও ৩ জন মারা যান।

এসআরবি জানায়, এই কর্মীরা তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে খরচ করে গত ৭ মে রাশিয়ায় যান। নির্মাণকাজের পরিবর্তে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

গত ১৩ অক্টোবর এই পাচারকারী চক্রের সন্দেহভাজন ২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জাতিসংঘ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতারণার মাধ্যমে ও জোর করে বিদেশি নাগরিকদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো নিয়োগ মানবপাচারের শামিল।

রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে থাকা ভুক্তভোগীদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। একইসঙ্গে এ ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত মানবপাচার নেটওয়ার্কের বিচার ও তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

কমিশন আরও বলছে, রুশ বাহিনীতে পাচার হওয়া ভুক্তভোগীদের ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দি হিসেবে তাদের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তারা বন্দি হোক কিংবা আত্মসমর্পণ করে থাকুক।

সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তাদের নাগরিকদের মুক্ত করতে রাশিয়ার সঙ্গে এবং যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে কাজ করার অনুরোধ জানিয়েছে জাতিসংঘ।

কমিশনের প্রস্তাব, যেসব দেশের নাগরিক মানবপাচারের শিকার হয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিষয়ে জানা গেছে, তারা যেন ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা বিচার না করে বরং তাদের ভুক্তভোগী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, 'ব্র্যাকের পক্ষ থেকেও এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। তখনো আমরা সতর্ক করেছি। রাশিয়ায় কর্মী হিসেবে পাঠিয়ে যুদ্ধে নিয়োগ করা হয়েছে। অনেকেই ভিসা নিয়ে সেখানে গেছেন। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সেই তথ্যগুলোই উঠে এসেছে।'

'বাংলাদেশের এখন উচিত কোনোভাবেই যেন নতুন করে কেউ রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি গত দুই বছরে আমাদের প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মানুষ বৈধভাবে রাশিয়ায় গেছেন। তাদের মধ্যে কতজন এখনো সেখানে কাজ করছেন, কতজন যুদ্ধে আছেন এবং কতজন বেঁচে আছেন, সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া জরুরি,' বলেন তিনি।

শরিফুল আরও বলেন, 'পর্যটন ভিসায় কতজন রাশিয়া গেছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার তা খতিয়ে দেখতে পারে। তাদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন, কতজন নিখোঁজ রয়েছেন এবং কতটি পরিবার তাদের স্বজনদের নিখোঁজের কথা বলছে, তাও খোঁজ নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি রুশ দূতাবাসের কাছ থেকে গত কয়েকবছরে কত বাংলাদেশিকে ভিসা দেওয়া হয়েছে এবং কী কারণে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করা উচিত।'

'যুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষ প্রাণ হারাবেন, এটা খুবই দুঃখজনক। আশা করি, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকার তার নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে,' যোগ করেন তিনি।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ