মাতৃত্ব জীবনের এক নতুন অধ্যায়, কিন্তু মা হওয়া মানেই কি অভিনয়জীবনে ইতি টানা? এই ধারণার সঙ্গে একমত নন বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়া। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, সন্তান জন্ম দিয়েছেন বলে কাজের সুযোগ হারাতে চান না তিনি। বরং সংসার, সন্তান ও পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে আরও ভালো কাজ করতে চান। নতুন ওয়েব সিরিজ ট্রাস্ট নো ওয়ান (Trust No One)-এ অভিনয়, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা, স্বামী রাঘব চাড্ডার সহযোগিতা এবং মাতৃত্বের পর ক্যারিয়ার নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানালেন এই অভিনেত্রী।
কোনো একটি কাজের প্রতি ভালো লাগা কখনও কখনও প্রথম পরিচয়েই তৈরি হয়ে যায়। পরিণীতির ক্ষেত্রেও ট্রাস্ট নো ওয়ান সিরিজের চিত্রনাট্য ছিল তেমনই এক অভিজ্ঞতা। চিত্রনাট্যটি হাতে পাওয়ার পর কী ঘটেছিল, তা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, বই পড়া তার অন্যতম প্রিয় অভ্যাস। তবে পড়তে বসলে মাঝেমধ্যে মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায়। সে কারণে অনেক সময় অন্য কাউকে দিয়ে পড়ে শোনতে পছন্দ করেন তিনি।
কিন্তু সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রা ও রেনসিল ডি’সিলভা যখন সিরিজটির চিত্রনাট্য পাঠান, তখন পরিণীতি শহরের বাইরে ছিলেন। তার ধারণা ছিল, পুরো চিত্রনাট্য শেষ করতে দু-তিন দিন সময় লাগবে। বাস্তবে ঘটেছিল ঠিক উল্টোটা। মাত্র আড়াই ঘণ্টায় এক বসায় পুরো চিত্রনাট্য পড়ে শেষ করেন তিনি।
শেষ পাতা পড়ার পরই তার মনে হয়েছিল, এই সিরিজে অভিনয় করতেই হবে। গল্পের আকর্ষণই তাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছিল। পাশাপাশি কাজটির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের নিয়েও যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন অভিনেত্রী।
পরিণীতির কথায়, চিত্রনাট্য এতটাই ভালো ছিল যে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো কারণই ছিল না। তার সঙ্গে নেটফ্লিক্সের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজের সুযোগ, প্রযোজক সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রা এবং পরিচালক রেনসিল ডি’সিলভার মতো অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি তার কাছে বিশেষ হয়ে ওঠে।
ট্রাস্ট নো ওয়ান সিরিজের শুটিংয়ের সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন পরিণীতি। জীবনের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। তবে শুটিংয়ের পরিবেশ এবং সহকর্মীদের সহযোগিতা তার অভিজ্ঞতাকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল।
অভিনেত্রী জানান, শুটিংয়ের সময় ইউনিটের সবাই তার শারীরিক অবস্থার প্রতি বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। কাজের পরিবেশে বাড়তি চাপ ছিল না, বরং সবাই একে অপরকে সহযোগিতা করেছেন। ফলে শুটিংয়ের সময়সূচি সামলাতেও বড় কোনো সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি তাকে।
পরিবারের সদস্যরাও এই সময়ে পরিণীতির পাশে ছিলেন। বিশেষ করে স্বামী রাঘব চাড্ডার সহযোগিতার কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে কৃতজ্ঞতা। সুখবরটি শোনার পরই রাঘব শিমলায় ছুটে গিয়েছিলেন। পরিণীতির মা, শাশুড়ি এবং ভাইয়েরাও তাকে দেখতে সেখানে পৌঁছে যান।
সেই সময়ের স্মৃতি মনে করে অভিনেত্রী আরও জানান, তারা মজা করে বলতেন, এই সিরিজ যেমন তার ছেলে নীরের অভিষেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তেমনই ওয়েব দুনিয়ায় তার নিজেরও অভিষেক। তাই কাজটি তার কাছে বরাবরই বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে।
মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা পরিণীতির জীবনকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। তবে মা হওয়ার কারণে অভিনয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। বরং সন্তান জন্মের পর একজন অভিনেত্রীর কাজের সুযোগ কমে যেতে পারে—এই আশঙ্কাই তাকে বেশি ভাবায়।
পরিণীতির মতে, মা হওয়া জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার কারণে পেশাগত জীবনে পিছিয়ে পড়তে হবে, এমনটা হওয়া উচিত নয়।
তিনি মনে করেন, কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না; অভিনেত্রীদের কাজের প্রস্তাবও পেতে হবে। মাতৃত্বের পরও যদি শুধু মা হওয়ার কারণে কোনো শিল্পী কাজের সুযোগ হারান, তবে তা তার কাছে অত্যন্ত হতাশাজনক হবে।
বলিউডে মাতৃত্বের পরও নিয়মিত কাজ করে চলেছেন এমন অভিনেত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। বিষয়টিকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখেন পরিণীতি। উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে আলিয়া ভাট, দীপিকা পাড়ুকোন এবং তার দিদি প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার নাম।
পরিণীতির মতে, তাদের প্রজন্মের অভিনেত্রীরা মাতৃত্বের পরও নিজেদের কাজ চালিয়ে যেতে পারছেন, যা আনন্দের বিষয়। প্রিয়াঙ্কা যেমন বলিউডের বাইরেও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে কাজ করছেন, তেমনই অন্য অভিনেত্রীরাও নিজেদের পেশাগত জায়গা ধরে রেখেছেন। তার বিশ্বাস, তারা এখন ভালো কাজ করছেন এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে আরও ভালো কাজ করার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনকেও বরাবর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিণীতি। পরিবার, বন্ধু, ভ্রমণ, ছুটি কাটানো, উৎসব কিংবা একান্তে নিজের জন্য কিছুটা সময়—জীবনের এই ছোট ছোট আনন্দগুলো তার কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
তবে মা হওয়ার পর সময়ের হিসাব অনেকটাই বদলে গেছে। এখন নিজের কাজের পাশাপাশি সন্তানের প্রয়োজন এবং পরিবারের দায়িত্বও সমান গুরুত্ব পায়। তাই জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি আগের চেয়ে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিণীতির কাছে সাফল্য মানে শুধু পেশাগত অর্জন নয়; বরং জীবনের বিভিন্ন দিককে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও প্রিয়জনদের সময় দেওয়া এবং নিজের ভালো থাকার দিকে নজর রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনীতির ব্যস্ততায় সময় কাটে রাঘব চাড্ডার, অন্যদিকে অভিনয়, শুটিং ও প্রচারের কাজে ব্যস্ত থাকেন পরিণীতি। ফলে তাদের ছোট্ট ছেলের দেখাশোনা কীভাবে হয়, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
এ বিষয়ে পরিণীতির উত্তর একেবারেই স্পষ্ট— সন্তানের দায়িত্ব তারা দুজন সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছেন।
অভিনেত্রীর কথায়, তারা দুজনেই মা-বাবা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই সন্তানের দায়িত্বও দুজনেরই। পরিণীতি যখন কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন রাঘব ছেলের সঙ্গে সময় কাটান। আবার রাঘবের কাজ থাকলে সন্তানের দায়িত্ব সামলান পরিণীতি।
অর্থাৎ, সংসার ও সন্তান পালনের দায়িত্বকে তারা একজনের ওপর চাপিয়ে দেননি। বরং নিজেদের কাজের সময় এবং প্রয়োজন বুঝে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।
পরিণীতির কাছে স্বামীর এই সহযোগিতা বিশেষভাবে মূল্যবান। কারণ, অভিনয়ের ব্যস্ততা সব সময় একই রকম থাকে না। কোনো দিন শুটিং বা কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তিনি। তখন রাঘবের আশ্বাস তাকে নতুন করে সাহস জোগায়।
পরিণীতি জানান, এমন অনেক দিন যায়, যখন কাজের শেষে তিনি একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে রাঘব তাকে আশ্বস্ত করেন, তিনি নিশ্চিন্তে কাজে যেতে পারেন, বাকি সব দায়িত্ব তিনি সামলে নেবেন।
স্বামীর এই ভরসা তার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। কারণ, পেশাগত জীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সন্তানকে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রেও দুজনের পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
পরিণীতি চোপড়া ও রাঘব চাড্ডার পেশাগত জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা। একজন অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত, অন্যজন রাজনীতির মানুষ। সংসারে তাদের বোঝাপড়া ভালো হলেও কাজের ক্ষেত্রে একে অপরকে পরামর্শ দেওয়ার অভ্যাস খুব একটা নেই।
রাজনীতির জটিল হিসাব, সংসদীয় বক্তৃতা কিংবা নির্বাচনের বিষয়ে নিজের বিশেষ জ্ঞান নেই বলেই জানান পরিণীতি। তাই এসব বিষয়ে রাঘবকে পরামর্শ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। অন্যদিকে সিনেমার চিত্রনাট্য বা অভিনয়ের জগতেও রাঘবের অভিজ্ঞতা সীমিত।
এই প্রসঙ্গে মজার একটি ঘটনাও শোনান অভিনেত্রী। কোথাও তার নিজের গান বাজছিল, অথচ গানটি যে তারই, তা রাঘবকে আলাদা করে জানাতে হয়েছিল তাকে!
ঘটনাটি বলতে গিয়ে হেসে ফেলেন পরিণীতি। তার বক্তব্য, কাজের ক্ষেত্রে দুজনের জগৎ আলাদা থাকাই ভালো। একে অপরের পেশাগত পরিসরে অযথা হস্তক্ষেপ না করেও যে ভালো বোঝাপড়া বজায় রাখা যায়, তাদের সম্পর্ক যেন তারই উদাহরণ।
পরিণীতি চোপড়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার গল্পে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক। একদিকে রয়েছে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শুটিং চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে মা হওয়ার পরও নিজের পেশাগত পরিচয় ধরে রাখার দৃঢ় ইচ্ছা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বামী রাঘব চাড্ডার সহযোগিতা, পরিবারের সমর্থন এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বাস্তব চিত্র।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর একটাই— মাতৃত্ব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও তা কোনো নারীর পেশাগত স্বপ্নের সমাপ্তি হতে পারে না। একজন নারী একই সঙ্গে মা এবং সফল পেশাজীবী হতে পারেন, যদি তার কাজের সুযোগ থাকে এবং পরিবার ও কর্মক্ষেত্র থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মেলে।
পরিণীতির কাছে তাই মা হওয়া মানে অভিনয়জীবন থেকে সরে দাঁড়ানো নয়। বরং জীবনের নতুন দায়িত্বকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে চলা। আর সেই পথচলায় নিজের পরিচয়, ভালোবাসার মানুষদের সময় দেওয়া এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে চান তিনি।



