প্রচলিত চাকরিতে কাজের সময়, কর্মস্থল ও দায়িত্ব সাধারণত নির্ধারিত থাকে। তবে ইন্স্যুরেন্স খাতের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট (এফএ) পেশায় এ ক্ষেত্রে অনেকখানি নমনীয়তা রয়েছে। নির্দিষ্ট অফিসে নির্দিষ্ট সময়ে বসে কাজ করার বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের সুবিধা অনুযায়ী কাজের সময় ও ধরন ঠিক করা যায়।
এর ফলে শিক্ষার্থী, গৃহিণী কিংবা সদ্য গ্র্যাজুয়েট হওয়া একজন ব্যক্তিও এ পেশায় যুক্ত হতে পারেন। সময়ের সঙ্গে নিজের গ্রাহকভিত্তি তৈরি হলে কাজের পরিধি ও আয় দুটিই বাড়তে পারে।
ইন্স্যুরেন্স প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রচলিত ধারণার এখনও বেশ ফারাক আছে। অনলাইন প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম নেক্সট লেভেলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলামিন মোহাম্মদ বলেন, এফএ বা ইন্স্যুরেন্স প্রতিনিধি বলতেই অনেকে শুধু পলিসি বিক্রির কথা ভাবেন। কারও কারও মধ্যে এই পেশা নিয়ে নেতিবাচক ধারণাও রয়েছে।“বীমা প্রতিনিধি দেখলেই আমরা একটু নাক সিটকাই বা একটু ইগনোর করার একটা প্রবণতা আমাদের মধ্যে থাকে। একসময় তাঁদের ধান্দাবাজ, ভণ্ড, প্রতারক, বাটপারও বলা হতো। কিন্তু ইন্স্যুরেন্স পেশাজীবী হচ্ছে বীমা উপদেষ্টা বা আর্থিক উপদেষ্টা। এই পেশায় মানুষের প্রয়োজন বুঝে তাকে সঠিক ইন্স্যুরেন্স পণ্য সম্পর্কে জানানো এবং তার পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।
গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের এফএ তারিকুল ইসলাম বলেন, “কোভিডের সময় চাকরি হারানোর পর গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করতাম। পরে এক সহকর্মীর কাছ থেকে এফএ পেশার কথা জেনে ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই কাজে যোগ দেই। কয়েক মাসের মধ্যেই আরও সাতজনকে আমি এফএ হিসেবে যুক্ত করি এবং প্রায় ২৫ জনের কাছে পলিসি বিক্রি করি। পরিশ্রম ও সততার সাথে লেগে থাকলে এই পেশায় অনেক সম্ভাবনা আছে।
এফএর কাজের একটি বড় অংশ হলো গ্রাহকের প্রয়োজন বোঝা। কারও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, কারও সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা কারও নিজের জন্য সুরক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। সেই প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্স্যুরেন্স পণ্য সম্পর্কে গ্রাহককে জানানো এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া তাঁর কাজের মধ্যে পড়ে।
পলিসি বিক্রির পরও সম্পর্ক শেষ হয় না। সময়মতো প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার বিষয়ে গ্রাহককে সহায়তা করা, পলিসি নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা বুঝিয়ে দেওয়া এবং ক্লেইমমের সময়ে গ্রাহক ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করা এফএর দায়িত্বের অংশ।
এফএর কাজের প্রভাব শুধু তাঁর নিজের আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন গ্রাহক প্রয়োজন অনুযায়ী পলিসি নিয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করতে পারেন। সেই পলিসি চালু থাকলে পরিবারের জন্যও একটি নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে। অন্যদিকে, এফএ পান কাজের বিনিময়ে কমিশন ও দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সুযোগ। ইন্স্যুরেন্সের পরিধি বাড়লে সরকারও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আনার পাশাপাশি এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আদায় করতে পারে।
আলামিন মোহাম্মদ এর ভাষায়, ইন্স্যুরেন্স একটি “উইন-উইন-উইন-উইন” ব্যবস্থা, যেখানে গ্রাহক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, ইন্স্যুরেন্স পেশাজীবী এবং সরকার, সকল অংশীদার নিজ নিজ জায়গা থেকে উপকৃত হন।
ইন্স্যুরেন্স উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এজেন্ট ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮৫৪ জন। নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এজেন্ট ২ হাজার ৪১৩ জন। সব মিলিয়ে ইন্স্যুরেন্স খাতে এজেন্টের সংখ্যা ৪ লাখ ৮১ হাজার ২৬৭।
ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তাঁদের ওপর নির্ভরশীল আরও লাখো মানুষও সরাসরি আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
প্রশিক্ষণ এ পেশার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পলিসির শর্ত, গ্রাহকের প্রয়োজন, বিক্রির পদ্ধতি এবং ক্লেইম-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা জরুরী। দীর্ঘদিন ইন্স্যুরেন্স প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে আলামিন মোহাম্মদ বলেন, “অনেক সময় প্রশিক্ষণের বদলে মোটিভেশন বা ডেভেলপমেন্ট মিটিংকেই প্রশিক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। এতে পলিসি বিক্রির ওপর জোর থাকলেও গ্রাহকের প্রয়োজন ও পণ্যের জ্ঞান যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
“শুধু বিক্রি করতে যাবেন না, মার্কেটিং করতে হবে, প্রয়োজন তৈরি করতে হবে,” তিনি যোগ করেন। অর্থাৎ একজন গ্রাহকের কাছে শুধু পলিসি বিক্রির চেষ্টা না করে কেন তাঁর ইন্স্যুরেন্স প্রয়োজন, সেটিও তাঁকে বোঝাতে হবে।
গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের চিফ রিটেইল বিজনেস অফিসার, মাহমুদুর রহমান খান বলেন, “আমরা কর্মীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিতভাবেই আবাসিক, অনাবাসিক এবং অনলাইন প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকি। বীমা পেশায় সফল হওয়ার জন্য যা যা গুণ থাকা জরুরি সেগুলো আয়ত্ত্ব করতে প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। বীমার খুঁটিনাটি বিষয় থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ- সকল দিককেই আমরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের কর্মীদের কাছে তুলে ধরি।
দেশে এই পেশার জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ ইনসিওরেন্স একাডেমি লাইফ ও নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স নিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগেও ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার ওপর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
ইন্স্যুরেন্স খাতে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট শুধু বিক্রয় প্রতিনিধি নন, গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির অন্যতম মাধ্যম। তাই তাঁদের কাজের পরিধি যত বাড়বে, ইন্স্যুরেন্স খাতের প্রসার তত বেশি ত্বরান্বিত হবে, বিস্তৃত হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
একই প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করার পর কারো বেতন বৃদ্ধি ও কারো কারো বৃদ্ধি না পাওয়া প্রসঙ্গে।
দু’বার প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনেও মরল না নারী আসামি!



