স্থাপত্যের মর্যাদাপূর্ণ রিবা আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছে রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি। নারী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, সুস্থতা ও সুযোগ-সুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি সাততলা কারখানাটির নকশার প্রশংসা করেছেন বিচারকেরা।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারখানাটির নকশায় রয়েছে সবুজে ঘেরা দেয়াল, ছায়াময় বারান্দা, পুকুরপাড়ের হাঁটার পথ ও শান্ত পরিবেশের উঠান। এসবের মাধ্যমে কর্মস্থলে প্রকৃতিকে যুক্ত করা হয়েছে।
রংপুর শহরে অবস্থিত ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের এই কারখানাটি বৃহস্পতিবার রিবা আন্তর্জাতিক পুরস্কার জেতে। পুরস্কারটির আয়োজক রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের (রিবা) বিচারকেরা ভবনটিকে ‘নীরব নম্রতার এক নিদর্শন’ বলে অভিহিত করেছেন।
বাংলাদেশের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নকশাবিদ আর্কিটেক্টস কারখানাটির নকশা করেছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী বসতবাড়ির ধরন থেকে তারা অনুপ্রেরণা নিয়েছে। এসব বাড়িতে সাধারণত উঠান ও পুকুর থাকে।
দুই বছর পরপর দেওয়া রিবা পুরস্কারে সাধারণত শুধু দৃষ্টিনন্দন ভবনের বদলে মানুষের জীবন ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত স্থাপত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির ক্ষেত্রে প্রায় ৫ হাজার কর্মীর কথা মাথায় রেখে নকশা করায় বিশেষ প্রশংসা পেয়েছেন স্থপতিরা। এই কর্মীদের বেশিরভাগই নারী।
কারখানাটিতে রয়েছে শিশুদের দেখাশোনার কেন্দ্র, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানোর ছায়াঘেরা জায়গা। প্রবেশপথে রয়েছে নারীর একটি বড় ভাস্কর্য। স্থপতিদের ভাষ্য, এটি ‘নারীর ক্ষমতায়নের শক্তি’ তুলে ধরে।
রিবার বিচারক দল সেপ্টেম্বরে কারখানাটি পরিদর্শন করে। তারা দেখেছেন, কারখানার কর্মীরা কাজের সময়ের বাইরেও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কারখানার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন। প্রকল্পটি কারখানার নকশা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি ‘বিকল্প মডেল’ তুলে ধরেছে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে শিল্পকারখানায় কর্মীদের কল্যাণকে কীভাবে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে রিবা।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ। তবে দেশের কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ নিয়ে শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ দীর্ঘদিনের।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে ঢাকার কাছে সাভারে পোশাক কারখানায় ঠাসা নয়তলা রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। এতে ১ হাজার ১০০ জনের মৃত্যু হয়। ভবনটির কাঠামোগত ত্রুটির পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতাও এ দুর্ঘটনার কারণ ছিল। ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের নিরাপত্তার উদ্বেগ উপেক্ষা করা হয়। অনেক শ্রমিককে আবার কাজে ফিরতে বাধ্য করা হয়েছিল।
এর বিপরীতে গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির নকশায় কর্মীদের সুস্থতা ও কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এটি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্তরভিত্তিক বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে বলে জানিয়েছে রিবা।
রিবা পুরস্কারের বিচারক প্যানেলের প্রধান বিজয় জৈন কারখানাটির বড় প্রবেশপথের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এই প্রবেশপথ শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিক সবাই ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশের বড় কারখানাগুলোতে সাধারণত শ্রমিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ থাকে। সেই প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির অভিন্ন প্রবেশপথকে ‘সমতার ভিত্তিতে সবার ব্যবহারের প্রবেশদ্বার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিজয় জৈন।
নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজিদ এম খন্দকার বৃহস্পতিবার পুরস্কার ঘোষণার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে শিল্পকারখানাও প্রাণবন্ত হতে পারে, মানুষকে ধারণ করতে পারে এবং অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।
তার ভাষ্য, ‘আমরা একটি সহজ প্রশ্ন তুলেছিলাম—যদি কারখানার নকশা প্রথমেই সেখানে কাজ করা মানুষের বাড়ি হিসেবে করা হতো, তাহলে কেমন হতো?
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি উঠান, বাগান, জলাধার ও ছায়াঘেরা বারান্দার নকশা এই প্রশ্ন থেকেই এসেছে। কারখানা এমন কোনো যন্ত্র হওয়া উচিত নয়, যা মানুষের শক্তি নিঃশেষ করে দেয়। বরং এটি এমন একটি জীবন্ত জায়গা হওয়া উচিত, যা মানুষের শক্তি ফিরিয়ে দেয়।
গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি পরিচালনা করে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি হাতে তৈরি গালিচার পাশাপাশি ডোরম্যাট ও বাথম্যাটসহ বিভিন্ন বস্ত্রপণ্য তৈরি করে।
রিবা আন্তর্জাতিক পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় থাকা চারটি ভবনের মধ্যে বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প ছিল। অন্যটি ঢাকায় অবস্থিত জলবায়ু-উপযোগী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। বাকি দুটি প্রকল্প বেলজিয়ামের। এর একটি ১৯৬০-এর দশকের একটি অফিস ভবন, যা আধুনিক ব্যবহারের উপযোগী করে সংস্কার করা হয়েছে। অন্যটি সম্প্রতি সম্প্রসারিত একটি শিল্পকলা প্রতিষ্ঠান।
২০১৬ সালে চালু হওয়া রিবা আন্তর্জাতিক পুরস্কারকে একটি ভবনের জন্য বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাধারণত প্রতি দুই বছর পরপর এই পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে একবার সময়সূচিতে ব্যাঘাত ঘটে। স্থাপত্যে দূরদর্শী ও উদ্ভাবনী চিন্তা এবং নকশার উৎকর্ষ দেখাতে পারা প্রকল্পগুলোকে এই পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হয়।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে পুরস্কারটি জিতেছিল স্পেনের বার্সেলোনায় নির্মিত ছয়তলা কাঠের সামাজিক আবাসন প্রকল্প। এর আগে ব্রাজিলের গ্রামীণ এলাকার একটি স্কুল, পেরুর লিমার একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি হাসপাতালও এই পুরস্কার জিতেছে।



