শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
২ঠা কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

‘নাইন এমএম পিস্তল নিয়ে ওরা বসে আছে, আমাকে গুলি করবে’

‘নাইন এমএম পিস্তল নিয়ে ওরা বসে আছে, আমাকে গুলি করবে’...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৮ পিএমসর্বশেষ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৮ পিএম
‘নাইন এমএম পিস্তল নিয়ে ওরা বসে আছে, আমাকে গুলি করবে’

‘আমি এখানে বসে থাকা অবস্থায়ই মেসেজ পাচ্ছি, তারা রাস্তায় দুটি অস্ত্র নিয়ে বসে আছে। একটি নাইন এমএম পিস্তল, সঙ্গে পাঁচটি গুলি। আমি যাওয়ার সময় তারা গুলি করবে। যদিও আজ আমি যাব না।

প্রায় ১০ মাস আগে নেত্রকোণার পুলিশ সুপারকে (এসপি) কথাগুলো বলেছিলেন নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির ওরফে আলিফ ফকির।

গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার তেলঞ্জিয়া এলাকায় আলিফকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোণা প্রতিনিধি ছিলেন।

গত বছরের ২৯ নভেম্বর নেত্রকোণার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেন মো. তরিকুল ইসলাম। পরদিন নিজের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে জেলার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন তিনি। সেখানে অস্ত্রধারীদের হুমকি, সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় সশস্ত্র অপরাধী চক্র এবং তাদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন আলিফ।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে কাজ করি। এ জেলার সহকর্মীরা তা জানেন। এখানকার দুর্ধর্ষ ও সশস্ত্র দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে আমি নিউজ করি। মাদক থেকে শুরু করে সব।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন আলিফ।

এসপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনার এই জেলার নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুটি উপজেলা হলো—কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর।

সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় অস্ত্রধারী চোরাকারবারি চক্র সম্পর্কে সতর্ক করে আলিফ বলেছিলেন, ‘আপনার বাড়ি চৌগাছা, ঝিকরগাছা যেমন, এই এলাকাটিও তেমন। চৌগাছার মতোই। এখানে চোরাকারবারিদের আটটি সংঘবদ্ধ দল রয়েছে। তারা অস্ত্র বহন করে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

আলিফ আরও বলেছিলেন, ‘এই কয়েকটি সংঘবদ্ধ দল আপনার জেলার পরিস্থিতি নাজুক করে তুলবে। তারা ককটেল, বিস্ফোরক ও মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা আপনার এলাকা। আপনার জেলায় অস্ত্র উদ্ধার বা বড় ধরনের যেসব অভিযান হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো না কোনোভাবে আমার কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে বলে মনে করতে পারেন। আপনি সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বললে নিজেও তথ্য পাবেন।

নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আলিফ বলেছিলেন, ‘সবার সামনে, সাক্ষী রেখে বলছি, এই আসামিদের ধরা না হলে হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, নয়তো তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। এখন সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।

সেসময় পুলিশ সুপার তার কাছে জানতে চান, ‘অপরাধী চক্রগুলোকে পুলিশ ধরেনি, নাকি ধরতে পারেনি।

জবাবে আলিফ বলেছিলেন, ‘তাদের ধরার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি।

আলিফ আরও জানান, তার বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলায়। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর এক নারীকে বিয়ে করে তিনি দুর্গাপুরে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন। তাদের একটি ছোট সন্তান রয়েছে। সন্তান বড় হলে নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।

তিনি বলেছিলেন, ‘ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ওই পল্লির বাড়িঘরও যেকোনো সময় জ্বালিয়ে দিতে পারে তারা। গতকালও চেষ্টা করেছিল, পারেনি। আজ হয়তো আমি থাকব না, তখন তারা তা করতে পারে। এতে সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১০ দিন আগেও আলিফ আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ৫ অক্টোবর কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তিনি জানান, তারা সীমান্তে বড় ধরনের একটি অপরাধের পরিকল্পনা করছে। এজন্য আমার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমিও তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম।

তিনি আরও বলেন, ‘আলিফ অনেক তথ্য দিয়ে আমাকে সহায়তা করতেন। তাই তথ্যের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইনি। তার সঙ্গে সেটিই ছিল আমার শেষ দেখা। পরে ১৫ অক্টোবর এ ঘটনা শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই।

আলিফ নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তার নিরাপত্তায় পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, জানতে চাইলে তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আলিফের জীবনের ঝুঁকির বিষয়টি সভায় জানালে দুর্গাপুর থানার ওসিকে সবসময় নিরাপত্তা দিতে বলেছিলাম। তাকেও বলেছিলাম, কোনো ধরনের নিরাপত্তাহীনতা বোধ করলে যেন আমাদের জানান। কিন্তু পরে তিনি আর কিছু জানাননি।

আলিফের উল্লেখ করা অস্ত্রধারী চক্রগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি বলেন, ‘এসব চক্র সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে ইমন নামে এক ব্যক্তির বিষয়ে আলিফ তথ্য দিয়েছিলেন।

‘আমরা ইমনকে গ্রেপ্তার করেছিলাম। কিন্তু তিনি জামিনে বেরিয়ে যান। ইমন একটি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। সন্দেহভাজনদের তালিকায় তার নাম রয়েছে। তাকেও খুঁজছি’, বলেন তিনি।

আলিফ হত্যা মামলার তদন্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে এসপি বলেন, ‘এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, তাই সময় লাগছে। আমি আমার দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কারা এ ঘটনায় জড়িত, সে বিষয়ে আমাদের একটা ধারণা হয়েছে। তদন্তের জন্য কমিটিও গঠন করেছি। আশা করছি, খুব দ্রুত রেজাল্ট পাবো।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ