শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
২ঠা কার্তিক, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

লালমনিরহাটে একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদ, ৮৩ বছর ধরে সম্প্রীতির বন্ধন

লালমনিরহাটে একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদ, ৮৩ বছর ধরে সম্প্রীতির বন্ধন...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ পিএমসর্বশেষ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
লালমনিরহাটে একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদ, ৮৩ বছর ধরে সম্প্রীতির বন্ধন

লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী এলাকায় একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি মন্দির ও একটি মসজিদ। দুই উপাসনালয়ের দূরত্ব মাত্র ছয় ফুট। একদিকে মন্দিরে পূজার ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও ঢাকের শব্দ, অন্যদিকে মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ৮৩ বছরের এই সহাবস্থানে কখনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতায় জায়গাটি হয়ে উঠেছে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালী মন্দিরে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য ভক্ত। ঢাকের শব্দ, পূজার আনুষ্ঠানিকতা আর মানুষের সমাগমে মুখর হয়ে উঠেছে মন্দিরের আঙিনা।

এর পাশেই জামে মসজিদে নির্বিঘ্নে চলছে নামাজ আদায়। নামাজের সময় মন্দিরে বন্ধ রাখা হয় বাদ্যযন্ত্র।

শুক্রবার রাতে কালীবাড়ী দুর্গা মন্দির পরিদর্শন করেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘প্রায় ৮৩ বছর ধরে একই আঙিনায় মন্দির ও মসজিদ রয়েছে। এ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ধর্মীয় সম্প্রীতির এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শুধু লালমনিরহাটের নয়, সারা বাংলাদেশের।

দুলু আরও বলেন, একই আঙিনায় মন্দির ও মসজিদের অবস্থান লালমনিরহাটকে সারা দেশে পরিচিত করেছে। এই সম্প্রীতি যেন অনন্তকাল অটুট থাকে, সে জন্য সবাইকে মানবিক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩৮ সালে। এর প্রায় ১০৫ বছর পর, ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মসজিদটি। সেই হিসাবে দুই উপাসনালয়ের পাশাপাশি অবস্থানের ইতিহাস ৮৩ বছরের।

মন্দিরের জমির পরিমাণ আট শতাংশ, আর মসজিদের পাঁচ শতাংশ। মাঝখানের প্রায় ১২ শতাংশ জমির মালিক অন্য একজন।

মন্দির ও মসজিদ কমিটির সদস্যদের ভাষ্য, জমির মালিক কখনো ওই আঙিনা দখলে নেওয়ার আগ্রহ দেখাননি।

স্থানীয়দের কাছে এই আঙিনা শুধু দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নয়; এটি পারস্পরিক আস্থা, সহমর্মিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতীক।

সম্প্রীতির এই দৃষ্টান্ত দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। তারা মন্দির ও মসজিদ ঘুরে দেখেন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং দুই সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা শোনেন।

টাঙ্গাইল থেকে আসা দর্শনার্থী আ ফ ম জাহিদুর রহমান (৬৫)সংবাদমাধ্যম বাংলাকে বলেন, ‘একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কয়েক যুগ ধরে এখানে কোনো বিরোধ হয়নি, এটি মানবতার চিরন্তন শিক্ষার দৃষ্টান্ত।

পাবনা থেকে আসা দর্শনার্থী সুব্রত চক্রবর্তী (৭০) জানান, কয়েকবার তিনি এই মন্দির ও মসজিদ পরিদর্শন করেছেন। সুযোগ পেলেই দুর্গাপূজার সময় এখানে ছুটে আসেন। গত বছরও এসেছিলেন, এবারও এসেছেন। লালমনিরহাটে এক আত্মীয়ের সুবাদে তার এখানে আসা হয়। প্রতিবারই জায়গাটি তাকে নতুন করে সম্প্রীতি ও শান্তির কথা মনে করিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, ‘এখানে এলে খুব ভালো লাগে। চিত্তটা নির্মল হয়ে যায়।

মসজিদের ইমাম মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে চলি। কোনো দিন কথা-কাটাকাটিও হয়নি। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন, সম্প্রীতির গল্প শুনে যান।

মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় হয় জানিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধই দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের ভিত্তি। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেনি; বরং একে অপরের প্রতি সম্মান সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।

মন্দির কমিটির সভাপতি ও পুরোহিত শঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, ‘নামাজের সময় আমরা বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখি। পূজা চলাকালে মুসলিম প্রতিবেশীরাও আমাদের সহযোগিতা করেন।

দুর্গাপূজার সময় বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগমে মন্দিরের আঙিনা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে জানিয়ে তিনি বলেন, এ সময়ও মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লিদের কাছ থেকে কখনো বিরক্তি বা অসহযোগিতার কথা শোনেননি তারা। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়েই ধর্মীয় উৎসব ও উপাসনা পরিচালিত হয়ে আসছে।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল বলেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে পূজা করতে পারেন, সে জন্য আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। এটি শুধু লালমনিরহাট নয়, সারা দেশের জন্যই ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দুর্গাপূজার সময় এখানে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, বহু বছর ধরে এখানে কোনো বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি। প্রতিবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি নিজেও নিয়মিত মন্দিরের নিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান বলেন, একই আঙিনায় মন্দির ও মসজিদের অবস্থান মনে করিয়ে দেয়, ধর্ম পালনের অধিকার সবার। সেই অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর মধ্য দিয়েই শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে। মত ও বিশ্বাসের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার চর্চা যে দীর্ঘস্থায়ী সম্প্রীতির ভিত্তি হতে পারে, এই আঙিনা তারই দৃষ্টান্ত।

তিনি বলেন, মন্দিরে পূজা করতে আসা ভক্তরা যাতে কোনো সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ