বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
২৯শে আশ্বিন, ১৪৩৩

ডেইলি বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ও বস্তুনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকা

জাতীয়

ফেসবুকে নারী হেনস্তাকারীদের পরিচয় সামনে আনছে ‘নো মোর সাইলেন্স’

ফেসবুকে নারী হেনস্তাকারীদের পরিচয় সামনে আনছে ‘নো মোর সাইলেন্স’...

ম
মুনতাসির মাহমুদ· বার্তা সম্পাদক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫১ পিএমসর্বশেষ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫১ পিএম
ফেসবুকে নারী হেনস্তাকারীদের পরিচয় সামনে আনছে ‘নো মোর সাইলেন্স’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নারীদের পোস্টে হরহামেশাই হেনস্তামূলক মন্তব্য দেখা যায়। এসব মন্তব্যকারীদের মধ্যে ফেক আইডি যেমন আছে, তেমনি আছে কিছু প্রকৃত আইডিও। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা এসব কমেন্ট করেন, তারা থেকে যান আড়ালে। আর এসব হেনস্তার মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান নারীরা।

যারা নারীদের পোস্টে হেনস্তামূলক মন্তব্য করেন, তাদের পরিচয় সামনে আনতে কাজ করছে ফেসবুকভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘নো মোর সাইলেন্স’। গত বছরের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা গ্রুপটিতে বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজারেরও বেশি।

গ্রুপ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত হেনস্তামূলক মন্তব্য করা প্রায় ১৫০ জনের পরিচয় তারা প্রকাশ করেছেন। আর এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫-২০ জনের ক্ষেত্রে তারা কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ করেছেন এবং কর্মক্ষেত্র থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা সতর্ক করা হয়েছে।

কেন খোলা হলো গ্রুপটি‘নো মোর সাইলেন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক আবির আহম্মেদ পিয়াস।সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, নিয়মিতই দেখতাম, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, ইনফ্লুয়েন্সার বা তারকাদের পোস্টে প্রচুর আপত্তিকর কমেন্ট আসে। এসব কমেন্টের বড় অংশই ব্যবহারকারীরা নিজেদের আসল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে করেন। অ্যানালাইসিস করে দেখেছি, বিভিন্ন পোস্টে যারা এসব মন্তব্য করেন, তারাই আবার নিজের অ্যাকাউন্টে ‘ভালো’ পোস্ট দেন। অর্থাৎ একই ব্যক্তির দ্বিমুখী আচরণ।

‘কমেন্ট সেকশনের এই হেনস্তা সবাই সাধারণত উপেক্ষা করে চলে যান। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। আমাদের মনে হয়েছে, পাবলিক তথ্যসহ জনসমক্ষে তুলে ধরা গেলে তাদের মধ্যে একধরনের ভয় তৈরি হবে। তারা জানবেন, একটি গ্রুপ এসব কমেন্ট পর্যবেক্ষণ করছে এবং সেগুলো প্রকাশ্যে তুলে ধরছে। সেই ভাবনা থেকেই গ্রুপটির সূচনা।

গ্রুপটিতে মডারেটর হিসেবে আছেন দুইজন। তাদের একজন উম্মে সুরাইয়া সুমি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা সুমি বর্তমানে উদ্যোক্তা। অন্যজন জাকিয়া হোসেন। তিনি উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

হেনস্তামূলক মন্তব্যকারীদের পোস্ট সংগ্রহ থেকে শুরু করে আইডি অ্যানালাইসিসের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছেন গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াস। বর্তমানে প্রতিষ্ঠাতা ও দুইজন মডারেটর মিলে অ্যানালাইসিসের কাজটি করেন।

উম্মে সুরাইয়া সুমি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যম, তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের পোস্টে যারা হেনস্তামূলক মন্তব্য করেন, আমরা সেগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে তাদের আইডিতে গিয়ে সব তথ্য অ্যানালাইসিস করে প্রমাণ সংগ্রহ করি। সব ধরনের পাবলিক ইনফরমেশন—যেমন কোথায় থাকেন, কী কাজ করেন, কী ধরনের পোস্ট দেন ইত্যাদি অ্যানালাইসিস করি। পরবর্তীতে সংগৃহীত তথ্য ও কমেন্টের স্ক্রিনশট দিয়ে আমরা একটি ফটোকার্ড বা কম্পাইলেশন তৈরি করি। সেখানে ব্যক্তির নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, কর্মস্থল এবং তার করা কমেন্ট উল্লেখ থাকে। এরপর সেটি প্রকাশ করি।

‘অনেকে ফেক আইডি দিয়ে এসব মন্তব্য করে থাকেন। সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার থাকে না। যেগুলো প্রকৃত আইডি, আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করি।

আবির আহম্মেদ পিয়াস বলেন, প্রথম কয়েক মাস আমরা শুধু গ্রুপেই পোস্ট দিতাম। পরবর্তী সময়ে সদস্যরা পরামর্শ দেন, এসব বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তির কর্মস্থলে ইমেইলের মাধ্যমে তথ্য পাঠালে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থা নিতে পারবে। এরপর থেকে আমরা এবং আমাদের গ্রুপের সদস্যরাও স্বপ্রণোদিত হয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানে ইমেইল পাঠানো শুরু করি।

সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সাইপ্রাসে বসবাসকারী এক ব্যক্তি একজনের পোস্টে হেনস্তামূলক মন্তব্য করেছিলেন। পরবর্তীতে আমরা তার বিষয়টি সামনে আনি। এরপর আমাদের গ্রুপের এক সদস্য সাইপ্রাসে ওই ব্যক্তির কর্মস্থলে ইমেইল পাঠালে তার চাকরি চলে যায়। একইসঙ্গে তার বসবাসের শহরের স্থানীয় কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি মেইলে জানানো হয়।

পিয়াস আরও জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির বিষয়ে প্রমাণসহ ইমেইল পাঠানোর পর তার প্রতিষ্ঠান বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করে এবং তাকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়।

তবে, এসব হেনস্তাকারীদের পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে ভুল পরিচয়ও সামনে আসার ঝুঁকি আছে। যেমন: কোনো নারীকে হেনস্তামূলক কমেন্ট করা ব্যক্তি ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দিতে পারেন। কেউ হয়তো এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন বলে ফেসবুক প্রোফাইলে লিখে রেখেছেন, প্রকৃতপক্ষে যেখানে তিনি কাজ করেন না। সেক্ষেত্রে ভুল প্রতিষ্ঠানের নাম হয়তো সামনে চলে আসতে পারে।

টি নিয়ে আবির আহম্মেদ পিয়াস বলেন, সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। আমরা এক তরুণের প্রোফাইল দেখে পোস্ট দিয়েছিলাম, সেখানে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন বলে উল্লেখ করেছিলাম তার অ্যাকাউন্ট থেকে তথ্য নিয়ে। পরে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হয়, এই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই এবং ওই অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে তারা আইনি ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ বাজে মন্তব্যকারী ওই তরুণ ভুল তথ্য দিয়েছেন তার অ্যাকাউন্টে।

‘এই ঘটনার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে আমরা আরও সতর্ক হয়েছি। আমরা আমাদের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া আরও নির্ভুল ও কার্যকর করার জন্য কাজ করছি। তবে, অনেক সময় কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না কিংবা করলেও সাড়া পাওয়া যায় না।

কারো ব্যাপারে পোস্ট দেওয়ার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয় কি না, জানতে চাইলে পিয়াস বলেন, শুরুতে আমরা এভাবে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অভিযুক্তদের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করা হলে তারা তৎক্ষণাৎ মন্তব্য ও পোস্ট ডিলিট করে দিতেন এবং বিষয়টি অস্বীকার করতেন। তাই আমরা আপাতত আগে থেকে যোগাযোগ করছি না। তবে, যাকে নিয়ে পোস্ট করা হয়, তিনি যদি তথ্য-প্রমাণসহ জানান যে কাজটি তিনি করেননি কিংবা তার আইডি হ্যাক হয়েছে, সেক্ষেত্রে আমরাও ভেরিফাইয়ের পর গ্রুপে পোস্ট দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বিষয়টি পরিষ্কার করে দেই।

টিমের কেউ যদি ব্যক্তিগত কোনো কারণে কারো বিরুদ্ধে পোস্ট দিতে চায়, সেক্ষেত্রে করণীয় কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, একদম শুরুর দিকে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। একজন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে এই ধরনের কাজ করতে চেয়েছিলেন। আমরা বুঝতে পেরে তাকে সতর্ক করি। দ্বিতীয়বার করার পর তৎক্ষণাৎ তাকে আমরা সরিয়ে দেই।

গ্রুপের সদস্য সংখ্যা কয়েক লাখ হয়ে গেলে এই প্ল্যাটফর্মকে বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো স্বার্থে ব্যবহার করা হবে না—এর নিশ্চয়তা কী? জানতে চাইলে পিয়াস বলেন, প্রায় এক বছর ধরে এই প্ল্যাটফর্মের পুরো কাজ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন অনেকেই বিনামূল্যে মডারেটর হিসেবে কাজ করার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু আমরা হুট করে কাউকে নিচ্ছি না, যাতে কেউ ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে ঢুকতে না পারেন। কাউকে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা অত্যন্ত সতর্ক থেকে সিদ্ধান্ত নেবো।

তার ভাষ্য, অনলাইনের এসব হেনস্তার কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না বলেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন।

গ্রুপটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারীরা ভুক্তভোগী—এমন সংবাদের নিচেও কেউ কেউ উল্টো তাদের দোষারোপ করেই অশালীন মন্তব্য করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারীকে মেরে ফেলা হয়েছে বা তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে—এমন ক্ষেত্রেও অনেকে অশালীন মন্তব্য করেছে। গ্রুপটিতে ওই মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে।

একটি পোস্টে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের ভিডিওটিতে অশালীন ও হেনস্তামূলক মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে।

নারী তারকা ও রাজনীতিবিদদের পোস্টে হেনস্তামূলক মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশ করেও কিছু পোস্ট দেওয়া হয়েছে।

আবার এই গ্রুপে পরিচয় প্রকাশের পর ভুল বুঝতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, এমন কয়েকজনের বিষয়েও পোস্ট দেখা গেছে।

উম্মে সুরাইয়া সুমি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়, তার নিচে হেনস্তামূলক মন্তব্য করেন অনেকে। আমরা পরিচয় প্রকাশের পর কেউ কেউ হয়তো তার ভুল বুঝতে পারে এবং নিজের কাজের জন্য ক্ষমা চায়, অনুতপ্ত হয়। আবার, আমাদেরকেও ইনবক্সে ফেক আইডি থেকে নানা ধরনের হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়।

অনলাইনে হয়রানি ও সহিংসতার মাত্রা বুঝতেসংবাদমাধ্যম ও বেসরকারি সংগঠন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ২০২০ সালের ২১ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে উঠে এসেছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৭৯ শতাংশের বেশি কখনো না কখনো অনলাইনে হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে নারী প্রায় ৫৩ শতাংশ। এই নারীদের বেশিরভাগ আপত্তিকর ও অপমানজনক মন্তব্যের শিকার হন।

কিছুদিন আগে ইউরোপে ঘুরতে যান অভিনেত্রী প্রিয়ন্তী উর্বী। ট্যুর চলাকালেই তিনি একটি ভিডিও আপলোড করেন ফেসবুকে, যেখানে তিনি জার্মানিতে কনটেইনার হোমে থাকার অভিজ্ঞতার কথা জানান। কিন্তু অনেকে ওই ভিডিওতে হেনস্তামূলত মন্তব্য করেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজেই ফেসবুকে পোস্ট করে বিষয়টির প্রতিবাদ জানান এবং ওই মন্তব্যগুলোর স্ক্রিনশট শেয়ার করেন।

প্রিয়ন্তী উর্বী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই ধরনের হেনস্তার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। এমন বিকৃত ও আপত্তিকর মন্তব্য দেখে আমি সত্যিই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। মানসিকভাবে একদম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমি ইউরোপে গিয়েছিলাম পরিবারের সঙ্গে। আমার পোস্টে এটাও জানতে চাওয়া হয়, আমি কার সঙ্গে ইউরোপে গিয়েছি! কিন্তু আমি কেন তাদের জবাব দেবো?

সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, কয়েকদিন আগেই আমার একটি পোস্টে একজন অশালীন মন্তব্য করেন। পরে আইডিতে গিয়ে দেখতে পেলাম তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় কাজ করেন। এতে বেশ অবাক হয়েছি।

উর্বী জানান, যেসব আইডি থেকে তার ইউরোপ ট্যুরের ভিডিওতে অশালীন মন্তব্য এসেছিল, এমন ৪০-৫০টি আইডি ব্লক করে দেওয়ার পর বিষয়টি বন্ধ হয়। ‘আমি অনেকের আইডি ঘুরে দেখেছি, সেখানে বেশিরভাগই বট অ্যাকাউন্ট মনে হয়েছে। তবে, কিছু ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজে পড়ে, এই বয়সীরাও অশালীন মন্তব্য করেছে। এতে ভীষণ অবাকও হয়েছি। এত অল্প বয়সীরাও এমন বাজে মন্তব্য করছে! তাহলে আমাদের পারিবারিক শিক্ষা কোথায় যাচ্ছে? সামনে এগোনোর বিপরীতে দিনকে দিন যেন আমরা কি তাহলে আরও পেছনের দিকে যাচ্ছি?

আবির আহম্মেদ পিয়াস বলেন, ‘আগে যারা অনলাইনে হেনস্তার শিকার হতেন, তাদের কাছে কমেন্ট ডিলিট করা বা রিপোর্ট করা ছাড়া তেমন কোনো উপায় ছিল না। কেউ কেউ হয়তো ফেসবুকে পোস্ট দিতেন। বর্তমানে ‘নো মোর সাইলেন্স’-এর মাধ্যমে তারা প্রতিবাদ জানাতে পারছেন।

দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কোনো নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা কোনো কিছু প্রদর্শনের মাধ্যমে অপমান করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধারায় এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ উপাদান প্রকাশের বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। এ ধারায় নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ভুয়া পরিচয়ে মানহানি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার এবং অনলাইন চরিত্রহননের মতো ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই সামাজিক চাপ, দোষারোপ ও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাসমিয়া নুহিয়া আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, অধিকাংশ নারী শুধু আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে আইনি প্রতিকার নিতে অনাগ্রহী হন না। সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রকাশের ভয়, প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার অনিশ্চয়তাও তাদের নিরুৎসাহিত করে। এক্ষেত্রে ‘নো মোর সাইলেন্স’-এর মতো উদ্যোগ নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা ও সচেতনতার প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। বিশেষত ভয়, লজ্জা বা সামাজিক চাপের কারণে যেসব নারী তাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন না, নিরাপদে তাদের কথা তুলে ধরতে এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হলে এটি নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে একটি কার্যকর সচেতনতা, সহায়তা ও আইনগত দিকনির্দেশনার প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।

তবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যেন আইনবহির্ভূত সামাজিক বিচার বা নতুন কোনো অন্যায়ের সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলেই যথাযথ তথ্যপ্রমাণ যাচাই ছাড়া তার ছবি, পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। এ ধরনের প্রকাশ নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং মানহানি, গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও পাল্টা আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ প্রচারের আগে তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট আইনি সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা জরুরি।

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, ‘তবে, যে প্ল্যাটফর্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং অন্যের জবাবদিহি দাবি করে, সেই প্ল্যাটফর্মের নিজের কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। গ্রুপটির কোনো সদস্য যদি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে ফাঁসানো কিংবা মিথ্যা অভিযোগ প্রচারের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন, তাহলে গ্রুপ কর্তৃপক্ষের উচিত হবে অবিলম্বে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় বা অভিযোগের প্রচার সীমিত রাখা এবং অভিযোগের শিকার ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিসংগত সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

‘যদি কোনো অভিযোগ মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পোস্ট অপসারণ, প্রকাশ্যে ভুল সংশোধন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সম্মান ও অধিকার পুনরুদ্ধারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। গ্রুপ পরিচালনাকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি সুস্পষ্ট অভিযোগ যাচাই নীতিমালা, নিরপেক্ষ পর্যালোচনা পদ্ধতি এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। গ্রুপের কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার সুযোগ থাকতে হবে।

তাসমিয়া নুহিয়া আহমেদ বলেন, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—কোনো অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত না হওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি, যাতে জবাবদিহির নামে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করার অধিকার বাধাগ্রস্ত না হয়।

‘এই প্ল্যাটফর্মটির বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করা হলো, তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং কোনো ভুল হলে গ্রুপটি কতটা দায়িত্বশীলভাবে তা সংশোধন করছে, তার ওপরও নির্ভর করবে। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয়ের অধিকার, মর্যাদা এবং ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ার সুরক্ষা নিশ্চিত করাই একটি দায়িত্বশীল প্ল্যাটফর্মের প্রকৃত পরিচয়।

📢এই সংবাদটি শেয়ার করুন

📢 আপনিও হোন পাঠক সাংবাদিক!

আপনার এলাকার যেকোনো খবর, সমস্যা বা ভিডিও সরাসরি আমাদের নিউজ পোর্টালে জমা দিন

সংবাদ পাঠান ↗
ম

মুনতাসির মাহমুদ

বার্তা সম্পাদক

নিউজরুম এডিটর, ডেইলি বরিশাল ডটকম। বার্তা বিভাগে অভিজ্ঞতা ৭ বছর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ